ক্রিকেট বিশ্বকাপের কিছু কথা


বুধবার,০৮/০৪/২০১৫
407

খবরইন্ডিয়াঅনলাইনঃ   কী অসাধারণ এক বিশ্বকাপ ক্রিকেট হয়ে গেল। তাসমানিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ছিল এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক। ১৪ ফেব্রুয়ারি শুরু। শেষ হলো ২৯ মার্চ। ৪৫ দিন পুরো বিশ্ব ক্রিকেটজ্বরে কেঁপে কেঁপে উঠেছে। কত কিছুই না ঘটেছে ১১তম আসরে। সবাই দেখেছেন অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেট কতটাই বদলে গেছে ভেতর থেকে। নান্দনিকতার পাশাপাশি ক্ষমতা যোগ হয়েছে ক্রিকেটে। রাজার খেলা ক্রিকেট এখন পরিণত হয়েছে খেলার রাজায়। কত কিছুই না ঘটেছে এবারের বিশ্বকাপে। প্রতিটি ম্যাচেই ছিল পায়ের হালকা চালের ছন্দ। ছিল অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ভাবগাম্ভীর্য। শিল্প ছিল প্রায় প্রতিটি ম্যাচে।

অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ভেনুগুলো ক্রিকেটারদের ‘ম্যাজিক টাচে’ ক্রিকেটের বিশাল ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে। মাঠে উপস্থিত দুই দলের ২২ ক্রিকেটার তাদের সেরাটা দেয়ার জন্য সব সময়ই ছিলেন প্রস্তুত। শত ওভারের ম্যাচে কত শত ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। রেকর্ড বুক হয়েছে আরো সমৃদ্ধ। বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার নিজেদের নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। কেউ কেউ নিজের কারিশমাকে নিয়ে গেছেন হিমালয়সম উচ্চতায়। ব্যাটে-বলের লড়াইয়ে প্রতিটি দলের খেলোয়াড়রা জয়ী হওয়ার জন্য লড়াই করে গেছেন। অধিনায়কের বুদ্ধিমত্তার সামনে প্রতিপক্ষ পেরে ওঠেনি। কিংবা বোলারকে ব্যবহার করেছেন অনেকটা চিন্তাভাবনা করেই। প্রতিটি ব্যাটসম্যান প্রতিটি ম্যাচেই ছিলেন এক একজন শিল্পী। সবুজ ঘাসের চত্বরে উইলো হাতে ফুটিয়ে তুলেছেন অনন্যসাধারণ শিল্পকর্ম। না শুধু চেয়ে চেয়ে দেখার বিষয় নয়, অনুভবও করার বিষয়।
আসলে এবারের বিশ্বকাপে অনেক কিছুই বদলে গেছে। প্রতিটি ভেনুতে রান হয়েছে প্রচুর। বোলারদের তেমন কিছুই করার ছিল না। তারপরও ফাস্ট বোলাররা নিজেদের সেরাটা মেলে ধরেছেন আপন মহিমায়। শট বলের গতিময়তায় বিস্মিত হতে হয়েছে। ছক্কার বিশালত্ব দেখে অবাক হয়েছেন দর্শক-সমর্থকেরা। বিশ্বকাপে ডাবল সেঞ্চুরি ছিল না। এবার হয়েছে। কিউই ব্যাটসম্যান মার্টিন গুপতিল ২৩৭ রান করেছেন। আর উইন্ডিজের ক্রিস গেইল করেন ২০১৫। এই বিশ্বকাপে স্পিনারদের ঘূর্ণিবলের জাদু তেমন দেখা যায়নি। ফলে পেসারদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত এই বিশ্বকাপে অসি মিচেল স্টার্ক এবং কিউই পেসার ট্রেন্ট বোল্ট ২২টি করে উইকেট নিয়ে সবাইকে চমকিত করেন।

আসলে বিশ্বকাপের সাতকাহন বলে শেষ করা যাবে না। কারণ এই প্রথমবার দু’টি আয়োজক দেশ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ফাইনালে অংশ নেয়। মেলবোর্নে রেকর্ডসংখ্যক ৯৩ হাজার দর্শক উপভোগ করলেন ফাইনাল। অস্ট্রেলিয়া ৭ উইকেটে হারিয়ে দেয় নিউজিল্যান্ডকে। ফাইনাল অনেকটা একপেশে খেলা হয়েছে। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে আগের ৮ ম্যাচে দেখা কিউই ঝড় মেলবোর্নে দেখা যায়নি। আর যাবেই বা কেমন করে। প্রথমবার ফাইনাল খেলতে নেমে বিগ ম্যাচের চাপ নিতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। ১৮৩ রানের মামুলি সংগ্রহ স্কোর বোর্ডে জমা করে তারা। পাল্টা ব্যাট করার সময় ১ রানে অসিরা তাদের ওপেনিং ব্যাটসম্যান ফিঞ্চকে হারালে সবাই বিশ্বকাপের ইতিহাসের দিকে তাকায়। কারণ ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবার ফাইনাল খেলতে নেমে ভারত করেছিল ১৮৩। এরপর ব্যাট করতে নেমে দাপুটে দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। ১৪০ রান করে অলআউট হয়ে যায় কপিল দেব বাহিনীর কাছে। তাই মেলবোর্ন ফাইনালের চরিত্র দেখে সবাই বলতে শুরু করেন ‘ইতিহাস কথা কয়’। অসিরা হয়তো হেরে যাবে। পুনরাবৃত্তি ঘটবে তৃতীয় বিশ্বকাপের। কিন্তু তা হয়নি। অসি অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক তার ক্যারিয়ারের শেষ ওয়ানডে স্মরণীয় করে রাখার জন্য অসাধারণ ৭৩ রানের ইনিংস উপহার দেন। জিতে গেল অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বকাপ জিতেই ক্লার্ক তার বর্ণাঢ্য ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টানলেন।
ফাইনালের তাসমানিয়া সাগরের এক পাড়ে হাসি-কান্নার দোলাচল। অন্য দিকে আরেক পাড়ে বেদনা এবং হতাশার কাব্য। নিউজিল্যান্ড পরাজিত হওয়ার পর দর্শকেরা অনেকেই কেঁদেছেন। বিশ্বকাপ না জেতার দুঃখবোধ কিউই ক্রিকেটারদের চক্ষু করেছে অশ্রুসজল। ফ্লাডলাইটের রুপালি আলোর বন্যায় তাদের চোখের পানি চিকচিক করেছে। আতশবাজির বর্ণিল আলোর বন্যায় কিউই ক্রিকেটারদের বিমর্ষ মুখগুলো দেখে বেদনায় আপ্লুত হয়েছেন অনেকেই। তাদের সাবেক অধিনায়ক মার্টিন ক্রো বলেছিলেন যে, মাঠে বসে এটাই তার শেষ ক্রিকেট ম্যাচ দেখা। তিনি চেয়েছিলেন ব্ল্যাকক্যাপরা শিরোপা জিতে তাকে এবং নিউজিল্যান্ডবাসীদের খুশিতে উদ্বেলিত করবে। কিন্তু তা হয়নি। এমনকি আশায় বুক বেঁধে আরেক সাবেক ক্রিকেটার স্টিফেন ফ্লেমিং বলেছিলেন, ম্যাককুলাম বাহিনী বিশ্বকাপ জয় করে গর্বিত স্বরে উচ্চারণ করবে আমরাও পারি। কিন্তু তা হয়নি। ফাইনালে তাদের আগ্রাসী ব্যাটিং কিংবা কারিশমা ছিল পুরোপুরি অনুপস্থিত। চেনা নিউজিল্যান্ড ফাইনালে অচেনা নিউজিল্যান্ড হিসেবে নিজেদের মেলে ধরেছে।
অন্য দিকে অকল্যান্ডে নাটকীয় ম্যাচে ১ উইকেটে কিউইদের কাছে পরাজিত হয়ে ছিল অস্ট্রেলিয়া। তাই ফাইনালে তাদের পেয়ে মধুর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য প্রস্তুত হয় ক্লার্ক বাহিনী। নিজেদের মাঠে প্রতিপক্ষকে হারানোর সুযোগকে কাজে লাগায় গোল্ডেন জার্সিধারীরা। দারুণভাবে চেপে ধরে অসিরা কিউইদের। ক্লার্কের দল পরিচালনা যেকোনো অধিনায়কের কাছে শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। একটি সেরা দল হিসেবে তারা মাঠে নিজেদের মেলে ধরে। জয়ী হওয়ার পর তাদের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ শতধা ফল্গুধারার মতো মেলবোর্ন ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ জয় করার উল্লাস তো ভিন্নরূপেই উপস্থিত হবে। হয়েছেও তাই। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো অসিরা উদযাপন করেছেন তাদের শিরোপা জয়ের উৎসব। উত্তেজনা এবং ক্রিকেট ফিভার তাদেরকে দিয়েছে অতিরিক্ত প্রাণশক্তি। আর দেবেই বা না কেন। পঞ্চমবারের মতো তারা ক্রিকেট বিশ্বকাপ শিরোপা নিজেদের ঘরে তুলেছে। ফুটবল বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিল পাঁচবার। দুই দলের জার্সিও প্রায় একই রঙের। এই মিল কাকতালীয় হলেও এখন বাস্তব। অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্ন ছিল নিজ দেশে বিশ্বকাপ জয় করার। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কারণ ’৯২ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া স্বাগতিক হলেও সে সময় শিরোপা জয় করেছিল এশিয়ার অন্যতম ক্রিকেট পরাশক্তি পাকিস্তান।
বাইশ বছর পর অস্ট্রেলিয়া নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পেল এবং তারা স্বপ্ন দেখতে শুরু করল যে, এবার জিততে হবে বিশ্বকাপ। এই মিশন শুরুর আগে অসি দল কম ধাক্কা খায়নি। নিয়মিত অধিনায়ক ক্লার্ক দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। অলরাউন্ডার ফকনার ইনজুরি থেকে সেরে ওঠার জন্য নিরন্তর লড়াই করতে থাকেন। তবে সময় যতই গড়ায় ততই অসি দলের সমস্যা কেটে উঠতে থাকে। সুস্থ হয়ে ওঠেন ক্লার্ক। মাঠে নামেন ফকনার। তারপরের ইতিহাস তো শুধুই সাফল্যগাথা মহাকাব্যের। লিগ পর্বে নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে যাওয়ার পর এগিয়ে যাওয়ার পালা। উত্তেজনা, নাটকীয়তা এবং রোমাঞ্চকর ক্রিকেট অধ্যায়ের সৃষ্টি করে মেলবোর্নে বিশ্বকাপে পঞ্চমবারের মতো হাত রাখা। এ যেন অসিদেরই মানায়। ক্রিকেট নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তাদের দলকে এইপর্যায়ে নিয়ে এসেছে। কিউইদের প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়ার পর অসিরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করে যে, এবারের বিশ্বকাপ তাদের। অসি সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং বলেছেন, ক্লার্ক বাহিনীতে তেমন কোনো দুর্বলতা নেই। তাই অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করতে পারে অস্ট্রেলিয়াই। ফাইনালে তাই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। হলুদের জয় হলো। তাই বিশ্বকাপ ক্রিকেটকে হলুদ রঙের বর্ণিল বিশ্বকাপ বললে নিশ্চয়ই ভুল বলা হবে না।

 

Loading...

চাক‌রির খবর

ভ্রমণ

হেঁসেল

    জানা অজানা

    সাহিত্য / কবিতা

    সম্পাদকীয়


    ফেসবুক আপডেট