ঈগল রিবার্থ রীট্রিট


রবিবার,২৪/১২/২০১৭

আহ্সানুল করিম: ডেঙ্গু-পরবর্তী অলস ও দুর্বল সময়ে বোলেরোতে ৪৩০ কিমি যাতায়াতটা বেশ চাপের ছিল ঠিকই, কিন্তু আমি যদি দাদা-বৌদি-ভাইপোর সঙ্গী না হতাম কাল সকালে (অনেক আগেই তারিখ ঠিক করা ছিল দুপক্ষের সিদ্ধান্তে), তবে আমার প্রাণের বন্ধু মতিন দেবনাথের আসল জন্ম ভিটে আর সেই ছায়া সুনিবিড় গ্রামকে ঘিরে এই অসামান্য মানুষটির স্বপ্নগুলো ছুঁয়ে দেখতে আমি আরও দেরি করে ফেলতাম।

এন.এইচ-৩১ সি ধরে আলিপুরের দিক থেকে বেরিয়ে বারোবিশা বা আসামের দিকে যেতে  কুড়ি কিমি পরে আসে চেপানি হল্ট যার প্রচলিত নাম “হাইরোড”, সেই স্টপেজ থেকে ডানদিকে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার রাস্তা ধরে মাত্র তিন কি.মি গেলেই খলিসামারি গ্রাম। ঐ স্টপেজ থেকে বাঁদিকে গেলে “বাকলা”। ডানদিকেই যাই। দেড় কিমি গেলে পূর্ব চেপানি বাজারে (খাপসাডাঙা) মতিনের পৈতৃক বাড়ি। আগে আমরা গেলাম খলিসামারি। কারণ মতিন তার ভাইয়েদের নিয়ে তখন সেই খলিসামারিতেই তার স্বপ্নের রেসিডেন্সিয়াল ট্রেনিং সেন্টারের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। পাকা রাস্তার ধারেই তাদের পারিবারিক মুড়ির মিল, চিড়ের মিল, চালের মিল, তেলের মিলের বড় বড় আর উঁচু উঁচু ঘরগুলো। এই দুসারি মিলসমূহের মাঝখানে উঠোন মতো। তাতে এক ধারে মুগির চাল শুকোচ্ছিল। তারপাশেই আবার চোখ জুড়নো ফুলের অনেকগুলো টব। সতেজ আর নয়নাভিরাম ফুলের দলে আছে: গাঁদা, ডালিয়া,গোলাপ, জিনিয়া ও চন্দ্রমল্লিকা। সেই উঠোন পার হলেই গাছ গাছালির এক স্নিগ্ধ পরিবেশ। দুদিকেই সেই সুশৃঙ্খল  টীকগাছের সোজা সারি দুটোর গায়ে হাল্কা সবুজ রঙের টানা হাফ- ওয়াল। নাইলন পলিথিন শীটের।সেই রাস্তাটুকু পার হতে হতেই সেই যুবক টীকেদের দলে কাঁঠাল, গামারি ও শালেরগাছও চোখে পড়ল। তবে সবার কান্ড পাঁচফুট উচ্চতা অবদি চুনকাম করা। তারপরে গেট। গেটের পরে কী, সেটা বলার আগে এই খলিসামারিতে ২৬/১২/১৭ সাকাল ১০ টা থেকে ঘটতে যাওয়া আবাসিক ট্রেনিংটির সম্পর্কে কিছু বলি।

পরিণত বয়স্ক নারী পুরুষদের জন্য এই আবাসিক প্রশিক্ষণটির নাম EAGLE REBIRTH RETREAT. ঈগল কেন? সে মতিনের নাকি মূল ইন্সপিরেশান। ঈগল বিশেষ। চল্লিশ বছরের বৃদ্ধ (প্রাথমিক ভাবে) ঈগলই তো পাহাড়ের নিরিবিলিতে গিয়ে তার ঝুলে পড়া পাখার পালকগুলো তুলে, ঠোঁট ও চঞ্চু পাথরের গায়ে ঘসে ঘসে একেবারেই ছোট্ট করে দিয়ে ৫১ দিন বিশেষ কিছু না খেয়ে প্রতীক্ষা করে নতুন পালাক, ঠোঁট,চঞ্চু গজাবার।সেসব গজায় ঠিকই। তারপরে বীর বিক্রমে সে নেমে আসে সমতলের বুকে,  আরও চল্লিশটি বছর মাথা উঁচু করে বাঁচতে। বৃষ্টি হলে অন্য পাখিরা যখন এখানে ওখানে আশ্রয় খোঁজে, সে মেঘের ওপরে ওপরে উড়ে চলে যায় আর তাইতে ভেজেও না। ঝড়ের সময়ে সে ভয় না পেয়ে পাখা মেলে দিয়ে চুপচাপ বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনেকটা ওপরে উঠে যায় অনায়াসে। তবে যত ওপরেই উঠুক বা উড়ুক, তার দৃষ্টি থাকে মাটিতে নিবদ্ধ আর সে বড় ফোকাসড্। ঝুপ করে নেমে এসে মাটির ওপরে চলমান শিকারকে সে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায়। ঠোঁটে করে নয়, পায়ের আঙ্গুলের ভাজে। সে শিকারকে পদানত করতে ভালোবাসে। আর সে টাটকা খাবারই খায় সব সময়। তাদের জীবনসঙ্গী নির্বাচনের পদ্ধতিটিও বিশেষত্বের দাবি রাখে। স্ত্রী ঈগল মুখে একটি গাছের ছোট ডাল নিয়ে ওপরে উঠে যায়। পুরুষ ঈগল যখন তাকে ফলো করে, তখন সে অনেক উঁচু থেকে ডালটি ফেলে দেয়। সেই ডালটি মাটিতে পড়ার আগে তাকে তুলে এনে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিতে হয়, বেশ কয়েকবার। মাতৃত্বের আর পিতৃত্বের আগে তারা যেভাবে বাসা তৈরি করে, যেভাবে তারা নবজাতকের পাহারা দেবার শিফটিং ডিউটি করে, যেভাবে বাচ্চাটিকে ঘাতসহ করে তোলে, তাতেও নাকি মানুষজাতির পক্ষে শিক্ষনীয় অনেক উপাদান আছে। তাই নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে। চলুক, আমরা গেট পার করি।

শুরুতেই বাঁহাতে হিউজ একটা ট্রেনিং হল। ডেকরেটারের তৈরি বিয়ের প্যান্ডালের মতো। কিন্তু তার ছাদটি “ভি” আকৃতির, তার রঙ অদ্ভুত সুন্দর ও স্নিগ্ধ আর মতিন বারবার করে বলছিল, ভাবিস না এগুলো ডেকরেটরের, সব নতুন কেনা আর আমার ডিজাইনের ওপর সাধারণ মিস্ত্রীরাই তৈরি করছে। সেই হলের দেওয়ালে নানারকম বাণী লেখা বিভিন্ন রঙের ফ্লেক্স পোস্টার।

“If you can manage your own mind, body and emotions and ENERGY, you can extraordinarily manage external situations and people”. সব শেষে “If you want to awaken all of humanity,then awaken all of yourself. If you want to eliminate the suffering in the world,then eliminate all that is dark and negative in yourself. Truly, the greatest gift you have to give is that of your own SELF-TRANSFORNATION -Lao Tzu.

হল থেকে বেরোতেই বাঁদিকে একটু দূরে একটি বড় পিরামিড, নাইলন পলিথিনের তৈরি। আরেকটু এগোতেই বাঁ পাশে পাকা ঘাট আর সিমেন্টের সিঁড়িওয়ালা একটি আর্টিফিসিয়াল পুকুর। মতিন বললো, সব ন্যাচারল করেছি। কারণ নেচারে অনেক শক্তি থাকে। আর পিরামিড? ঐ বিশেষ আকৃতির জন্য পিরামিড একটা নিজস্ব শক্তি পায়। নইলে মমিগুলো শুধুই প্রিজার্ভেটিভের গুণে এতদিন থাকত না। এটা আমার প্রশিক্ষণের কাজে লাগে। আরও একটু এগিয়ে ডানদিকে মহিলাদের আর আরও একটু এগিয়ে বাঁদিকে পুরুষদের থাকার ঢালাও ব্যবস্থা। আরও দূরে ট্রেনিং হলের ঠিক বিপরীতে যে সার সার বাথরুম আর সেগুলোের মুখোমুখি একটু তফাতে সার সার ইস্টার্ণ ও ওয়েস্টার্ণ ল্যাভাটরিজ, সেগুলোও একেবারে নতুন তৈরি করা। হাতে সময় কম, কারণ আমাদের সময়ের পথ খরচাই প্রায় দশ ঘন্টা। বেড়িয়ে আসার সময়, মিলগুলো ঘুরে দেখার আগে ডানদিকে নব্য যুবক গাছেদের সাম্রাজ্যে চোখ রাখি আবার। দেখতে পাই সেখানে একটু দূরে ফায়ার উড আর চুলোর ব্যবস্থা। মতিন জানালো ট্রেনিঙের ছ’দিনের সবার খাবার এখানেই তৈরি হবে।

মতিনকেও গাড়িতে তুলে নিয়ে পূর্ব চেপানি বাজারে মতিনের বাড়িতে চলে আসি আমরা। বাড়িতে ঢোকার দুটো গেট। একটা মূল পাকা রাস্তার গায়েই, আরেকটি হাট বসা মাঠের দিক থেকে আসা সরু রাস্তাটার গায়ে। লম্বা দুসারি ঘরের বাড়িটার পেছনের গেট পাকা রাস্তা আর ওপাশের মাঠের সংযোগকারী গলিটিতে উন্মুক্ত। দুসারি লম্বা লম্বা ঘরের লইনদুটির মাঝে উঠোন। সেই উঠোনে, বিল্ডিঙের গা ঘেঁষে কতো গাছ: নারকেল, সুপারি,গাঁদা, তুলসি, পেয়ারা, তেজপাতা, আমলকি,কুল, লাউ, ছিম, কলা, লঙ্কা, পালংশাক, ডাটা শাক, লটে শাক। সেসব দেখতে দেখতে এগোতে এগোতে ডানহাতে সেই বিশাল ঘরটা চোখে পড়ল যার সামনে অর্ধবৃত্তকারে লেখা আছে: মা সরস্বতী এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন। আরসিসি পিলারওয়ালা উঁচু টিন ট্রাসের ছাদওয়ালা সেই ঘরটির মাপ আশি ফুট বাই চল্লিশ ফুট। তার একদিকে ডায়াস। ট্রেনিঙের জন্য। সেই ডায়াসটিই আবার তাদের পারিবারিক দুর্গাপূজার মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। সেই বড় ঘরটিতে সাইকেল চালাচ্ছিল তার ভাইঝি। অনেক হোয়াইট বোর্ড ঝোলানো আর অনেক টেবিল চেয়ার রাখা সেই ঘরটিতেই চলে বাচ্চাদের স্কুলও। সকাল আটটায় প্রাতরাশ করে বেরিয়েছিলাম। তখন আড়াইট বেজে গেছে। ছুঁচোর কেত্তন থামাতে মতিনের বোন আর দুই বৌমা রান্নাঘরের হাইবেঞ্চ লোবেঞ্চে বসিয়েই আমাদের দারুণ লাঞ্চ করালো। বহুদিন বাদে সেরকম মুসুরডাল, বেগুন ভাজা, চাকা চাকা আর ভেজা ভেজা আলু ভাজার স্বাদ পেলাম। ফ্রেশ ফুলকপি আর আলুর তরকারিও অনেক পুরনো স্বাদ ও গন্ধ মনে করিয়ে দিল। মতিন বললো, তুই তো জানিস আমি নিরামিষাশী হয়ে গেছি আদ্যোপান্ত। সে আর জানি না? বন্ধুমহলে জোরজার করে একটু আমিষ খাইয়ে দিলেও যে তোর শেষদিকে বমি হয়ে যেত, সেকথাও অজানা নেই। তোর যে Self transformation টা ভালোই হয়েছে, সেটা আর জানি না?

মতিন অনেক ছাত্রকে সময় দিতে লাগলো। তারাও দূর প্রদেশ থেকে এসেছে। দাদা বৌদি আর সেইসব পেরেন্টের সাথে বসে মতিনের উঠোনে আড্ডা মেরে,পান খেয়ে পাশের মাঠে সংক্ষেপ বাজার করে, বোনের হাতে বানানো লিকার চা খেয়ে যখন রওনা হই, তখনই সন্ধ্যে নেমে গেছে। আলিপুরদুয়ারের দমনপুর মোর হয়ে ডুয়ার্সের রাস্তায় আসতে আসতে ভাবলাম, আমিও যদি যোগ দিতে পারতাম এই ছ’দিনের ট্রেনিঙে? না, তার উপায় নেই। শরীর, অফিস। আসতে আসতে মনে হলো, মতিন ঠিকই লিখেছে। কেরিয়ার, চাকরি,ব্যবসা নিয়ে মানুষ চ্যালেঞ্জের সামনে পড়েই। অর্থকরি আর সম্পদ নিয়ে সংগ্রাম থাকে। স্ট্রেস, স্ট্রেইন আর পেইন জীবনে থাকেই। পরিবারের সদস্যদের সাথে, বন্ধু বান্ধবদের সাথে, পার্টনারদের সাথে সম্পর্কের অবনতি তো হয়ই। মানুষ এসবের থেকে উত্তরণ চায়। মানুষ সুস্বাস্থ্য, সুখ, উন্নতি, শান্তি আকাঙ্খা করেই। আমি জানি পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান আর  প্রাচ্যের জ্ঞানের সাহায্যে মতিন সেল্ফ রিয়ালাইজেশন আর সেল্ফ ট্রান্সফরমেশানের ক্ষমতা ও দক্ষতা রাখেই। ঐ যে ENERGY র কথা লেখা আছে, তার সঠিক ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে জীবনে বিপ্লব আর নবজাগরণ সম্ভব। অনেকটা ঈগলের পুনর্জীবন লাভের মতো। মাঝ বয়সে পুনর্নবিকরণের মতো। চরৈবেতি দোস্ত্। ওরকম একটি শিবিরেই দেখা হবে  আবার।  ওহ্ পরের প্রোগ্রাম তো আবার মহারাষ্ট্রে আর পুরুলিয়ায়! তাহলে পরের বছর? এই খলিসামারিতেই?

MAA SARASWATI EDUCATIONAL TRUST

www.lifeskillmantra.com

Mob. 9433252894

চাক‌রির খবর

ভ্রমণ

হেঁসেল

জানা অজানা

সাহিত্য / কবিতা

সম্পাদকীয়


ফেসবুক আপডেট