‘বন কে মাইরে ধন কে বাগাই’


শনিবার,২৮/০৪/২০১৮
111

অশোক মজুমদার: মানেকা গান্ধীর কথা শুনে আমার ওপরের মানভূমি গানটা মনে পড়ে গেল। কিছুদিন আগেই শালীনতা ও সৌজন্যের ধার না ধেরেই তিনি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেছেন, ‘ আদিবাসী মানুষের ভোট পাওয়ার জন্যই নাকি আমাদের দিদি বাগঘড়ার জঙ্গলে বাঘটির হত্যাকারীদের মদত দিচ্ছেন। তাঁর মতে এটা স্থানীয় আদিবাসীদের কাজ। অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করা উচিৎ। আমার মনে হয় শুধু মানেকা নয়, এটা আমাদের দেশের এক শ্রেণীর এন জি ও শাসিত তথাকথিত পরিবেশপ্রেমীদের একটা এলিটিস্ট বায়াস। এরা অরণ্যের সন্তানদের বাদ দিয়ে অরণ্য ও বন্যপ্রাণকে বাঁচাতে যান। ভূমিপুত্রদের বনের শত্রু সাজিয়ে যেনতেন প্রকারেণ একটা বড় ফান্ড বাগানো এদের মূল উদ্দেশ্য।

মানেকার জানা উচিৎ যে বনবাসী ও বনজীবী মানুষেরা অরণ্যের পূজারী। তারা জঙ্গল থেকে কাঠকুটো আহরণ করেন জ্বালানির জন্যে এবং বাঁচার প্রয়োজনে কিন্তু কোন পরিকল্পিত বৃক্ষনিধন যজ্ঞে এরা যুক্ত থাকেন না। এভাবে কোন সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত করাটা বস্তুত অপরাধ। অবশ্য মানেকাদের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক। কারণ বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ক্রমশই সঙ্কুচিত করে চলেছে বনবাসীদের অধিকার। খাদ্যের প্রয়োজনে ও নিজেদের প্রথা মানতে গিয়ে দু-চারটে বেজি, বনশুয়োর কিংবা বনবেড়ালের মত ছোট-খাটো কোন প্রাণী হয়তো এদের হাতে মারা পড়ে, কিন্তু বাঘ, হাতির মত কোন বন্যপ্রান এদের হাতে পরিকল্পিত ভাবে আক্রান্ত হয় না। জঙ্গলে বড় গাছ কাটা বৃক্ষ ব্যবসায়ীদের কাজ। চামড়া, দাঁত, নখ, বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ওষুধ ইত্যাদির প্রয়োজনে বন্যপ্রাণীর লাগাতার নিধন এবং বাঘ, হাতি, ভাল্লুক, চিতা ইত্যাদি মারা চোরাশিকারিদের কাজ। কখনও নানা প্রলোভন দেখিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে দু-চারজন আদিবাসী মানুষকে তারা একাজে টেনে আনে কিন্ত সামগ্রিক ভাবে আদিবাসীরা মোটেই একাজে যুক্ত নন।

আরেকটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে আত্মরক্ষার অধিকার সবার রয়েছে। জঙ্গলে বন্যপ্রাণীদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পর আত্মরক্ষার জন্য তাকে আঘাত করার ফলে কোন প্রাণী মারা যেতে পারে। উল্টোটাও হতে পারে। এই বিশেষ ঘটনাগুলির কোন সাধারণীকরণ করা যায় না। এমনকি বাঘটির হত্যাকারীদের সঙ্গে ঘটনাচক্রে কোন আদিবাসী জড়িয়ে পড়লেও তার জন্য গোটা আদিবাসী সমাজকে বন্যপ্রাণ হত্যাকারী বলে দেগে দেওয়াটা ভুল। কিন্তু শখের অরণ্যবিলাসী ও বন্যপ্রাণপ্রেমী মানুষদের একথা কে বোঝাবে!

মানেকার একথা বলার কোন মুখই নেই। কারণ তিনি যে সরকারের মন্ত্রী সেই দল ও সরকার গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি অরণ্য নিধন করেছে। কিছুদিন আগে পাওয়া হিসেব থেকে দেখা যাচ্ছে দেশে প্রতিবছর ১ কোটি ৩৭ লক্ষ একর বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। তাদের আমলেই বন্যপ্রাণ হত্যা হয়েছে সবথেকে বেশি, বনের জমিতে সবচেয়ে বেশি চলেছে কর্পোরেট লুণ্ঠন। যার ধাক্কায় ধ্বংস হচ্ছে গাছ ও বন্যপ্রাণ। আজ তারাই দোষ চাপাচ্ছে দিদির ও আদিবাসীদের ওপর। ২০১৩ সালে বনাধিকার আইনেই দেশের বিভিন্ন অরণ্য অধ্যুষিত এলাকায় আদিবাসীরা জমির বৈধ মালিকানা পেয়েছে। সেখান থেকে নিজেদের বাঁচার প্রয়োজনে তাদের কাঠকুটো আহরণের ওপর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। তাদের বনে ঢুকতে না দেওয়া সেই অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ। কেন্দ্রীয় সরকারের মদতে ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, ছত্তিসগড়ে এই ঘটনাই ঘটছে। আর ঠিক উল্টো ঘটছে পশ্চিমবঙ্গে। দিদি ক্ষমতায় আসার পর এখানে বন বেড়েছে, বাড়ছে বন্যপ্রাণ এমনকি বাঘও। এটা কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষজ্ঞরাই বলেছেন।

আমার সাফ কথা, বাগঘড়ায় বাঘ হত্যার অপরাধীদের অবশ্যই ধরতে হবে কিন্তু তার জন্য শহুরে শখের পরিবেশবাদীদের বনবাসী মানুষদের ওপর দোষ চাপানো চলবে না। অরণ্য শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি তাতে বনবাসীদের কোন অধিকার নেই ব্রিটিশ আমলের এই ধারণাটা এবার মানেকাদের বদলে ফেলা উচিৎ।

এই লেখাটা লেখার সময় খবর পেলাম গত সপ্তাহে মানেকার নির্বাচনী কেন্দ্র পিলভিট ন্যাশনাল পার্কেও একটা বাঘ চোরাশিকারিদের হাতে মারা গেছে। শখের পরিবেশবাদীরা এবার কাকে দোষ দেবেন? আসলে অপরাধীদের কোন জাত, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় কিছুই হয়না। তারা শুধুই অপরাধী। সেখানে এসব আনতে নেই। রাজনীতি আর নিজেকে বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ প্রমাণ করার তাড়নায় মানেকা এই ভুলটি করেছেন। যে কবিতাটি দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম তা তো আসলে বনবাসীদের কান্না। যাতে বলা হচ্ছে জঙ্গল ধ্বংস করে তাকে লুঠ করে আজ তোমরা মহান হয়েছো।

চাক‌রির খবর

ভ্রমণ

হেঁসেল

জানা অজানা

সাহিত্য / কবিতা

সম্পাদকীয়


ফেসবুক আপডেট