আশার ছলনে ভুলি…


শনিবার,১৪/০৭/২০১৮
279

অশোক মজুমদার---

আজ সকালে টালিগঞ্জের মোড়ে বিজেপির ‘কৃষক কল্যাণ’ সমাবেশের হোর্ডিং দেখে হাসি পেল। যে দেশের দুই তৃতীয়াংশ মানুষ কৃষক সে দেশের কৃষকদের নিয়ে এতবড় ঠাট্টা সাম্প্রতিক সময়ে আর দেখিনি। ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক কৃষক বিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের একেবারে সর্বনাশের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন যে নরেন্দ্র মোদী তিনিই সোমবার পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে ছুটে আসছেন ‘কৃষক কল্যাণ’ করতে! দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাজ্যে রাজ্যে তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের কাজকারবারের দু চারটে নমুনা পেশ করলেই তারা কেমন ‘কৃষক কল্যাণ’ করছেন তা বোঝা যাবে। উত্তরপ্রদেশের এক গরীব কৃষকের জমি দখলের লোকসান মেটাতে তাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ তিন পয়সার চেক ধরিয়েছেন সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী আদিত্য যোগী। মধ্যপ্রদেশের মান্দাসৌরে পুলিসের গুলিতে মারা গেছেন তাদের ন্যায্য দাবী নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভরত চারজন কৃষক। মহারাষ্ট্রের বঞ্চিত কৃষকদের রক্তাক্ত পায়ে নাসিক থেকে মুম্বাই লং মার্চের স্মৃতি এখনও টাটকা। সেই মোদী কিনা স্বাধীনতা ও কৃষক আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত মেদিনীপুরে কৃষকদের কল্যাণের কথা বলতে আসছেন। ইতিহাসের এ এক পরম কৌতুক।

সমাবেশের বিজ্ঞাপনের ছবিতে প্রধানমন্ত্রীর বেশ একটা ‘কনফিডেন্ট’ ভাব আছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি যে কতটা নড়বড়ে তা তার এই তৎপরতা দেখলেই বোঝা যায়। জমির অধিকার প্রদান, গ্রামীণ মানুষ ও কৃষিজীবীদের উন্নয়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ, জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি, সেচ সমস্যার সমাধান, কৃষি ঋণ মুকুব, কৃষকদের কাছ থেকে কেনা খাদ্যশস্যের নুন্যতম সংগ্রহ মুল্যবৃদ্ধি প্রতিটি ক্ষেত্রেই মোদীজি সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সত্যি বলতে কি একশ্রেণীর ধনী শিল্পপতিদের পদলেহন করা ছাড়া অন্যকিছু তার চিন্তাভাবনার মধ্যেও নেই। তার ধ্যানজ্ঞান সবকিছুই যেনতেন প্রকারেণ পেটোয়া শিল্পপতিদের অবাধ লুঠপাটের সুযোগ করে দেওয়া। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাদের শাসিত রাজ্যের জমি থেকে উৎখাত হয়েছেন কৃষকরা, লুঠ হয়েছে জঙ্গল লাগোয়া অঞ্চলের আদিবাসী মানুষের সামান্য জমি এমনকি তাদের অরণ্যের অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। কথায় বলে নিজের পাপের কথা আর কারও মনে না থাকলেও পাপীদের মনে থাকে। ভোট আসছে, নিজের পাপের কথা জানেন বলেই তার কৃষকপ্রেম এখন উথলে উঠেছে। ভোট বড় বালাই।

এই যাদের ট্র্যাক রেকর্ড আগামী সাধারণ নির্বাচনে তাদের ফল যে খুব ভাল হবে না এটা বোঝার জন্য রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার কোন দরকার নেই। বলা বাহুল্য, কেন্দ্রে তো নয়ই, এমনকি গোটা দেশের বিজেপি শাসিত কোন রাজ্যেই শাসকদলের অবস্থা ভাল নয়। এ বছরের শেষেই রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে ভোট। সেখানে দলীয় কোন্দল, জনবিরোধী রাজনীতি, কৃষকবিরোধী সিদ্ধান্ত ইত্যাদি নানা কারণে মানুষ, বিশেষত কৃষকরা তাদের ওপর ক্ষিপ্ত। এই দুই রাজ্যেই তাদের পরাজয় অনিবার্য। দলের থিঙ্ক ট্যাঙ্করা বলে দিয়েছেন বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে দলের আসন কমবে। এই ক্ষতিপূরণ করতে মোদী- অমিত জুটি এখন পাখির চোখ করেছেন পশ্চিমবঙ্গকে। তাই এরাজ্যে তাদের আনাগোনা বাড়বে। বাড়বে কৃষকদের প্রতি লোকদেখানো দরদ। যে পশ্চিমবঙ্গে ‘কৃষক কল্যাণে’ মোদীজি আসছেন সেই রাজ্যেরই কৃষি খাতের প্রাপ্য বরাদ্দ তিনি নিয়ম করে কমাচ্ছেন।

কৃষকদের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য তাদের সর্বশেষ প্রতারণাটি হল কৃষিপণ্যের নূন্যতম সহায়ক মূল্য ১৫০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি। আমি নিশ্চিত মেদিনীপুরেও প্রধানমন্ত্রী একথা বলবেন। আগের কোন সরকার নাকি এমন কাজ করতে পারেন নি। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের খরচ বেড়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। বস্তুত এটা সংখ্যাতত্বের জাগলারি ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, নূন্যতম সংগ্রহ মূল্যের টাকাটা কৃষকরা পাবেন না আবার এটা কাগজে কলমে বাড়ার কারণে যে দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি হবে তার চাপটা তাদের উপরই পড়বে। ফড়ে দালালরা কৃষকদের অভাবের সুযোগ নিয়ে মাঠে গিয়ে অনেক কম দামে তাদের কাছ থেকে ধান কিনবে। পরে সেই ধান সরকারকেই আরও বেশি দামে বিক্রি করবে। এরই পাশাপাশি পেট্রোল, ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষকদের চাষের সেচের জন্য ডিজেল চালিত পাম্প সেটের খরচ বাড়বে। বাড়বে পরিবহণ বাবদ স্কুটার ও মোটরবাইকের জ্বালানির খরচ।

এদিকে মোদী নোটবন্দী নীতিতে সর্বস্বান্ত হয়েছেন দেশের গরীব কৃষকরা। জিএস টির জন্য চাষের খরচ বেড়েছে। সার, ট্রাক্টর ও কৃষি উপকরণ, টায়ার, টিউব, কীটনাশক, হিমঘর সবকিছুতেই আগের চাইতে অনেক বেশি টাকা দিতে হচ্ছে কৃষকদের। শুধু কমেই চলেছে তাদের ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদিত ফসলের দাম। বহুক্ষেত্রে চাষের খরচই উঠছে না। এদিকে কৃষকদের উন্নয়নের জন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে ফসল বীমার ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এতেও বীমা কোম্পানি ছাড়া আর কারও লাভ হচ্ছে না। স্বাধীনতার পর থেকে গোটা দেশে এত বড় জনবিরোধী সরকার আসেনি বলে দিদি যে কথা বলে থাকেন মোদীর কৃষিনীতির দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কি করেছেন তা কৃষকরা নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই জানেন। এখানে তার ফিরিস্তি দেবো না। গ্রামের মানুষই তার মূল শক্তি। তাদের কথা ভেবে দিদি পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের সব রাজ্যের প্রধান ফসলগুলির নূন্যতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা ও কৃষিঋণ মুকুব করার করার দাবি জানিয়েছেন। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থকেই তিনি অগ্রাধিকার দেন। মেদিনীপুরে মোদীজির সমাবেশের চেহারাই প্রমাণ করে দেবে প্রধানমন্ত্রীর নির্জলা মিথ্যে রাজ্যের মানুষ ঘৃণায় প্রত্যাখ্যান করছেন। বাংলায় যে তিনি খাপ খুলতে পারবেন না তা এই সমাবেশই প্রমাণ করে দেবে। আর নরেন্দ্র মোদীও বুঝবেন দু চারটে স্তাবক ও ক্ষমতালোভীর কথায় ভুলে পশ্চিমবঙ্গ দখলের স্বপ্ন দেখে তিনি আসলে মরীচিকার পিছনে ছুটছেন।

চাক‌রির খবর

ভ্রমণ

হেঁসেল

জানা অজানা

সাহিত্য / কবিতা

সম্পাদকীয়


ফেসবুক আপডেট