হাসপাতালের বেডে শুয়েও গণিত সাধনায় মগ্ন ছিলেন রামানুজন


শনিবার,০১/০৫/২০২১
810

                                                                  অনিন্দিতামাইতিনন্দী

ছেলেবেলা থেকেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি অদ্ভুত এক আকর্ষণ আমার- সুর বৈচিত্রের মাধুর্য্যে মুগ্ধ বিভোর হয়ে  শুনতাম- কৈশোর কাটিয়ে যৌবনের প্রারম্ভে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাণীগুলি গভীরভাবে দোলা দিত। কৈশোরের শেষ বেলায় ‘প্রেম’ শব্দটি বড্ড মনোরম, রোমাঞ্চকর, হদয়ের দ্বারে দোলা দেয়, -ডাক দেয়,- ‘ক্ষুধার্ত প্রেম তার, নাই লজ্জা, নাই ভয়’। আসলে বয়ঃসন্ধিতে রবীন্দ্রনাথ যেন সংগীত বানীতে হদয়ের মর্মস্থল স্পর্শ করে যান, “আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী”। কখনো বা মনে প্রশ্ন জাগিয়ে যান, ‘সখি ভালোবাসা কারে কয়’? 

শৈশব থেকে যৌবন পথে বয়ঃসন্ধির আগমন, শরীর ও মনে ঘটে যায় বিভিন্ন পরিবর্তন  -নানা বিস্ফোরণ যা পরবর্তীকালে ব্যক্তিত্ব গঠনে বিকশিত হতে প্রভাব ফেলে। বয়ঃসন্ধি এমন একটি সময়-পর্ব যার সূচনা শরীরে, একটি দৈহিক মানসিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতা। সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে বয়ঃসন্ধিতেই। ‘প্রেম’, ‘ভালোবাসা’ শব্দ দুটি মোহময়ী রূপে ধরা দেয় হৃদয়ের  ‘গোপন বিজন ঘরে’।

আচ্ছা প্রেম কাকে বলে? এই প্রেম কেমন হয় ?- এর স্বরূপ কেমন? –মনের ভেতর থেকে কে যেন নীরবে জানান দেয়, “প্রেম কীসে হয়, তা কেউ কি জানে? -কখনো চোখে চোখে, কখনো ছবি এঁকে, কখনো মনে মনে”- 

ছবি এঁকে ও প্রেম হয়?!! হয়ই তো! প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ আর্কিমিডিস গভীর মনোযোগ সহকারে বালির উপর জ্যামিতিক চিত্র-অঙ্কন করে চলেছেন, রোমান সৈন্যরা তখন আর্কিমিডিসের শহর আক্রমণের পথে- একজন রোমান সৈন্য তাঁকে সম্রাট মার্সেলাসের সঙ্গে দেখা করতে বলায় তিনি উত্তরে বলেন, ‘আগে অঙ্কটা করে নিই, তারপর তোমার রাজার কাছে যাব’।

 এত স্পর্ধা!! রোমান সৈন্যের হুংকার আর্কিমিডিসের কর্ণে প্রবেশ করেনি, এতই নিমগ্ন তিনি জ্যামিতিক চিত্রাঙ্কনে, সৈন্যটি ক্রোধে উন্মত্ত অবস্থায় তরবারির এক কোপে এই মহান বিজ্ঞানীর দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

সত্যি তো! এ কী গভীর ‘অঙ্ক প্রেম’ যে আর্কিমিডিস জ্যামিতির গাণিতিক অঙ্কন নিয়ে এত নিমগ্ন, এত নিবিষ্ট সাধনায় মগ্ন, যে সৈন্যের প্রবল হুংকারও তার গাণিতিক ধ্যান-ধারণায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে না- সৈন্যের পরাক্রমকে অবলীলায় অবজ্ঞা করে মৃত্যুবরণ করতে পারেন!! তাহলে গণিত বিষয়টি নিশ্চয়ই অত্যন্ত আকর্ষণীয়- গণিতের গভীর প্রেমে পড়লেই এমন নিমগ্ন সাধনায় নিবিষ্ট হওয়া যায়। -আর্কিমিডিস জীবন দিয়ে ‘গণিত ভালোবাসা’ ও ‘অঙ্ক প্রেমের’ যে গভীর নিদর্শণ রেখে গেলেন, অনবদ্য সে ভালোবাসা। তাই মৃত্যু কে আলিঙ্গন করেও শেষ মুহুর্তে বলেন, ‘আমার আঁকা বৃত্তগুলির তোমরা কোন ক্ষতি করোনা’। 

 গণিত প্রেমিক আর্কিমিডিসের মর্মস্পর্শী মৃত্যুকাহিনী নতুন করে গণিতপ্রেমী করে তোলে আর এক কিশোরী সোফি জারমেঁ (Marie Sophie Germain) কে, পরবর্তীকালে অসাধারণ গণিতজ্ঞ হয়ে ওঠেন তিনি।  

‘গণিত প্রেমে’ এমন পাগল হওয়া যায়! অঙ্ক তো সাহিত্য নয় কিংবা কাব্যও নয়,– নয় কোনো  কল্পবিজ্ঞানের গল্প অথবা গোয়েন্দা কাহিনী,— তাহলে কী এমন অপরূপ রসসিক্ত এই মোহময়ী গণিত?–যার প্রেমে প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠতম গণিতজ্ঞ শ্রীনিবাস রামানুজন তাঁর প্রতিভার দ্যুতি ও মেধার ব্যাপ্তিতে সারা বিশ্বকে মোহিত করেছিলেন। আসলে গণিত সুন্দরী বড়োই রহস্যময়ী। তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের যেন শেষ নাই। এ যেন মোনালিসার হাসির মতোই, ‘শেষ নাহি যার শেষ কথা কে বলবে।’

আসলে গণিত হল এমন এক উপভোগ্য বিষয়, যার মধ্যে মজা ও আনন্দ অফুরাণ। গণিত রসসিক্ত হয়েই বোঝা যায় এটি আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। 

মাকড়সা জাল বোঝার সময় সুষম বহুভূজকে প্রয়োগ করে, আবার মৌমাছিরা মৌচাক তৈরীর সময় চরমমানের ধারণাকে ব্যবহার করে। মৌচাকের উপরিভাগে সুষম ষড়ভূজগুলি পাশাপাশি রয়েছে যাতে সর্বাধিক পরিমাণের মধু সঞ্চিত থাকতে পারে। আসলে ‘Hexagons fit most closely together without any gap’ আবার পশুদের যাত্রাপথ লক্ষ্য করলে অবাক হতে হয়- দুটি বিন্দুর মধ্যে ক্ষুদ্রতম দূরত্ব অতিক্রম করতে হলে যে সরলরেখা বরাবর যেতে হয়, তা যেন পশুরা অবিকল মেনে চলে। কোনো কোনো ব্যাকটেরিয়া গুণোত্তর শ্রেণীতে (Geometric Progression) বৃদ্ধি পায়। খরগোশের বংশবৃদ্ধির সাথে ফিবোনাকি সংখ্যাকে (Fibonacci Numbers) জোড়া হয়।

মজার ব্যপার হল, গণিতে ফিবোনাকি নম্বরের সঙ্গে সূর্যমুখী ফুলের পাপড়ির বিন্যাসের সংখ্যা, কিংবা ডেইজি ফুলের পাপড়ির পরপর সাজানো সংখ্যা, এমনকি আনারসের উপরিভাগের পত্রগুচ্ছের বিন্যাসের সংখ্যার অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। আবার এমনই গাণিতিক মজা রয়েছে মানুষের মুখমণ্ডলে, যে মুখমণ্ডল যত বেশী প্রতিসাম্য পূর্ণ (Symmetric) হবে, ততই সৌন্দর্যপূর্ণ, আকর্ষণীয়, মোহময়ী, লাবন্যপূর্ণ হবে এবং এটি ‘Golden  Ratio’ এর উপর নির্ভরশীল।

কিছু প্রাকৃতিক বস্তুর বিন্যাস— লগারিদমিক স্পাইরালের মতো (Logarithmic Spiral)।  এখানেও গণিতের প্রয়োগ, যেমন শামুকের গঠন, হাতির দাঁত, কিংবা সূর্যমুখীর বীজ বিন্যাস। তাছাড়া সমীকরণ তত্ত্বে, জেনেটিক্সে, ইলেকট্রনিক্সে ও সংখ্যাতত্ত্বের প্রাসঙ্গিতা রয়েছে। তাই প্রকৃতির এই অপরূপ গণিতখেলার প্রয়োগ লক্ষ্য করে বলা যায়, “The great architect of the universe now begins to appear a pure mathematician.”–(জে. এইচ. জিনিস্)

আসলে গণিত হল বিজ্ঞানের ভাষা। গণিতবিদ্যার বিকাশে প্রাচীনকাল থেকেই অবদান ভারতের। ‘সবকিছু বেদেই আছে’ –কথাটি আপাতদৃষ্টিতে একটু অন্যরূপ মনে হলেও ভারতের গণিত তথা বিশ্বগণিতের উৎস লুকিয়ে আছে বৈদিক যুগেই। বৈদিক সভ্যতাতে একটি ভাগ হল বেদাঙ্গ বা সূত্রবিদ্যা। এই বেদাঙ্গে জ্যামিতি বা গণিতের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কিত আলোচনা বিষ্ময়কর। আবার শুল্বযুগে (খূঃ পূঃ ৮00-৫00 অব্দ) বীজগণিত ছিল জ্যামিতি নির্ভরশীল। বীজগণিতকে প্রথম সতন্ত্র রূপ দেন আর্যভট্ট ‘কুট্টকগণিত’ হিসাবে।

প্রাচীন যুগ থেকেই গণিতপ্রেমী অনেকেই ছিলেন –এক এক দেশের এক একজন দিকপাল গণিতজ্ঞ অঙ্কপ্রেমে সারাজীবন নিমজ্জিত ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক কালে জানা যায় কেরালাতে এমন একজন গণিত প্রেমিক ছিলেন যিনি বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক নিউটনের অনেককাল আগেও ক্যালকুলাস নিয়ে ভাবতে পেরেছিলেন। শুধুমাত্র গণিতকে ভালোবেসে, অসাধারণ মেধাশক্তি, স্মৃতিক্ষমতা, অকল্পনীয় অণুমান ক্ষমতার দ্বারা তিনি সর্বদেশের সর্বকালের সেরা গণিতজ্ঞ লিওনার্ড অয়লার (Euler), কার্ল ফ্রেডরিক গাউস (Carl Friedrich Gauss) এর সমপর্যায়ে  নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন  বিষ্ময়কর প্রতিভা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ত্ব রামানুজন।

 ‘Discovery of India’ গ্রন্থে জহরলাল নেহেরু লেখেন “ভারতীয় গণিত অবশ্যই প্রত্যেককে সাম্প্রতিক সময়ের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের সম্বন্ধে ভাবাবে। তিনি শ্রীনিবাস রামানুজন।”

গণিতবিদদের যুবরাজ হলেন, পৃথিবীখ্যাত গণিতজ্ঞ কার্ল ফ্রেডরিখ গাউস, তার মতানুযায়ী, “বিজ্ঞানের রাণী হল গণিত, আর সংখ্যাতত্ত্ব হল গণিতের রাণী (Mathematics is the queen of the sciences and number-theory the queen of Mathematics)”   সংখ্যার সম্পৃক্ত ভাবধারায় সারা জগৎ নিমজ্জিত।আর সংখ্যাতত্ত্বের অধিশ্বর হলেন রামানুজন। তাই সংখ্যাতত্ত্ববিদ হ্যারল্ড হার্ডি বলেন, “Number constituted the true fabric of the universe”।

হার্ডি ছিলেন “Purest of Pure” বিশুদ্ধ গণিতের পূজারি। গণিতই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র প্রেম, সৌন্দর্য উপভোগ ও তৃপ্তি লাভ করার অন্যতম উপকরণ। এই গডফ্রে হ্যারল্ড হার্ডির নিজস্ব কিছু চিন্তাভাবনা নীতিবোধের মধ্যে, ..তিনি স্বাধীনচেতা, গণিতপ্রেমী, ক্রিকেট আগ্রহী সাথে নিরিশ্বরবাদী ও ফ্যাসী বিরোধী ব্যক্তিত্ব। একদিকে যেমন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গণিতের ব্যবহারকে অনুমতি দেননি, আবার অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে বা ধ্বংসকার্যে গণিতের ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট। আসলে গণিত গবেষণাই ছিল তাঁর ‘Permanent Happiness’। 

তবে হ্যারল্ড হার্ডি শুধু প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ হিসাবে নয়, আর এক মহান গণিতজ্ঞ রামানুজনের মেণ্টর হিসাবে বিশ্ববন্দিত। তিনি সেই বরেণ্য গণিতজ্ঞ যিনি রামানুজনের প্রকৃত মূল্যায়ণ করে ক্ষান্ত হননি, বরং এই অনন্য প্রতিভার সার্বিক বিকাশের পথ সুগম ও প্রশস্ত করেছিলেন। প্রথাগত শিক্ষার অভাব এবং আধুনিক গণিতের বিকাশ ও অগ্রগতির সাথে প্রায় অপরিচিত হওয়ায় রামানুজনের প্রতিভার বিকাশ যাতে ব্যাহত না হয়, সর্বটাই সচেষ্ট ছিলেন হার্ডি।

রামানুজনের সৃজনশীলতা কে অদম্য গতিবেগ দিয়েছিলেন হ্যারল্ড হার্ডি, তাঁর পেশাগত প্রখর বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য্য ও অসীম প্রজ্ঞার সহায়তায়। রামানুজনের প্রতিভার পূর্ণ প্রকাশে আসল চালিকাশক্তি বা ইঞ্জিন ছিলেন মেন্টর হার্ডি। নিরন্তর পরিশ্রম ও প্রতিভায় ভাস্বর কর্মক্ষেত্রে দীপ্যমান বিজ্ঞানীদের জীবনে বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত, সাধনা ও সংগ্রামে নানা রোমাঞ্চকর অধ্যায় গল্পকথা থাকে যা অনেক সময় অবাস্তব বা রূপকথার গল্পের মতোই আলোড়ন জাগায়। তেমনি এক আখ্যান ইংরেজ গণিতজ্ঞ হার্ডি ও ভারতীয় গণিতজ্ঞ  রামানুজনের জীবনে-

 ১৯১৮ সালে ফেব্রুয়ারীর প্রথমদিকেই চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন প্রখ্যাত ভারতীয় গণিতজ্ঞ শ্রীনিবাস রামানুজন। তবে ট্রেনের চালকের তৎপরতায় মাত্র কয়েক ফুট দূরত্বে আস্ত ট্রেনটিকে থামাতে সমর্থ হয়েছিলেন চালক- ফলে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচলেও আত্মহত্যার চেষ্টার দায়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পরেই সেখানে পৌঁছে যান হার্ডি এবং বয়ান দেন যে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি রয়েল সোসাইটির ফেলো, তাই একজন এফ. আর. এস. (FRS: Fellow of the Royal Society) কে গ্রেপ্তার করা যায় না। আসলে তখনও কিন্তু এই ভারতীয় গণিতজ্ঞ রামানুজন এফ. আর. এস. হননি –তা সত্ত্বেও হার্ডি মিথ্যে হলফনামা দিয়েছিলেন এই প্রখ্যাত ভারতীয় গণিতজ্ঞকে গ্রেপ্তার অবস্থা থেকে মু্ক্ত করতে। মজার ব্যপার হল স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের লোকেরা যথাযথ খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিলেন গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিত্ব সত্যিকারের এক অনন্য গণিত প্রতিভাধর, তাই তারা এই গণিত ব্যক্তিত্বের অযথা জীবন নষ্ট না করে নিঃশব্দে, নিঃশর্তে মুক্তি দিয়েছিলেন। গণিত ইতিহাসে হার্ডি-রামানুজন এর  জুটি অসামান্য  এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

 শৈশবকাল থেকেই মানুষের মনে  সৃষ্টি হয় অদম্য কৌতুহল – তা যেকোন প্রাকৃতিক ঘটনা কী কারণে বা কেন ঘটে তা জানা মানুষের স্বভাবজাত প্রয়াস। রামানুজনের মনেও শৈশবকাল থেকেই অদম্য কৌতুহল বিভিন্ন গণিত সমস্যা সমাধানে। একেবারেই নিম্নশ্রেণীতে পড়াকালীন গণিত শিক্ষক বোঝান,–‘তিনটি আম তিনজনের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিলে প্রত্যেকে একটি করে আম পাবে। আবার হাজারটা আম হাজার জনের মধ্যে সমান ভাগ করে দিলে প্রত্যেকে একটা পাবে’। 

এবার গণিত মাষ্টারমশাই এই উদাহরণ দিয়ে সামান্য সরলীকরণের জন্য বলেন, ‘যে কোনো সংখ্যাকে সেই সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে ভাগফল এক (১) হবে।’ সাথে সাথে শিশু রামানুজন প্রশ্ন করেন, “If no fruits are divided among nobody, will each get one?” –অর্থাৎ শূণ্যকে শূণ্য দ্বারা ভাগ করলে কি ভাগফল এক (১) হবে? অর্থাৎ 0/0 (শূণ্য বাই শূণ্য) যে গণিতে অসংজ্ঞাত – তা ওই শিশু বয়সেও অসাধারণ সূক্ষ মেধা সম্পন্ন গণিতভাবনায় প্রতিফলিত হয়েছে।

গণিতের একনিষ্ঠ সাধক রামানুজন, তীব্র অর্থকষ্ট, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও চিরমগ্ন গণিতরাণীর প্রেমে। প্রবল অসুস্থতা নিয়েও মৃত্যুর চারদিন আগে পর্যন্ত গণিতে নতুন নতুন সংযোজনে ব্যস্ত থাকতেন।গণিতপ্রেমী রামানুজনের জীবন কাহিনীতে নানারকম আকর্ষণীয় উপকথার মতো –এক গল্পকথা তাঁর জন্মকাহিনী। এক উচ্চবংশীয় নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ দম্পতি কুপুস্বামী শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার ও কোমলতাম্মলের দীর্ঘকাল নিঃসন্তান অবস্থায় এক স্থানীয় পুরোহিতের পরামর্শে পাশের শহর নামাক্কলের অতি জাগ্রত দেবী, ‘নামগিরি’র শরণাপন্ন হন এবং বিশেষভাবে পূজার্চনা করেন সন্তান কামনায়। এর পরেই দেবীর স্বপ্নাদেশ– সন্তানসম্ভবা হন কোমলতাম্মল এবং জন্ম নেন বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ শ্রীনিবাস রামানুজন।

ছোট্ট বয়সে চেহারায় আলাদা কোন বৈশিষ্ট্য ছিল না অসাধারনত্বের কিন্তু তাঁর স্বপ্নালু, উজ্জ্বল, প্রখর জ্যোতি সম্পন্ন চোখ দুটি হয়ত বা ভবিষ্যতের দিশারী ছিল। ছোট বয়েস থেকেই তিনি দেবী ‘নামগিরি’র পরম  ভক্ত ছিলেন, অটল বিশ্বাস ছিল দেবীর ওপর। পরবর্তীকালে রামানুজন বন্ধুদের কাছে বলেছেন যে তাঁর প্রায় সমস্ত গাণিতিক অনুমান ও প্রজ্ঞা তিনি দেবী ‘নামগিরি’র কাছ থেকেই পেয়েছেন। দেবী তাঁকে স্বপ্নে সূত্র বলে দিতেন। এমনও অনেক সময় হয়েছে আবিষ্কারের আনন্দে, গণিত ভাবনায় নিমজ্জিত, বিহ্বল, আপ্লুত রামানুজন গণিত সাধনায় তীব্র গতিতে কখনো বা মধ্যরাত, কখনো বা ভোরের আলো দেখা পর্যন্ত শ্রান্তিহীন, ক্লান্তিহীন, নিদ্রাহীন, অবশেষে গণিত সম্মোহনে যেই একটুখানি ঘুমের ঘোরে,.. অমনি স্বপ্নে ধরা দেন দেবী ‘নামগিরি’…সমস্ত অঙ্ক নিমিষে সমাধান, সমস্ত সূত্র ধরা দেয় চোখের সামনে। তড়িৎ গতিতে নিদ্রাভঙ্গ অবস্থায় রামানুজন তাঁর বিখ্যাত নোটবুক লিখে ফেলেন স্বপ্নে পাওয়া গণিতের সূত্রগুলি।

 মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মনের অপূর্ণ ইচ্ছা বা সুপ্ত কামনাগুলি মানুষ স্বপ্ন-মাধ্যমে পরিপূর্ণ করে। বহু সমস্যার সমাধান সূত্র স্বপ্নের মাধ্যমেই পাওয়া গিয়েছে। অনেক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার স্বপ্ন মাধ্যমেই পাওয়া – যেমন পরমাণুর গঠনতত্ত্ব কিংবা বেঞ্জিন রিঙের গঠন প্রকৃতি, সেলাই মেশিনের সূচ ইত্যাদি।অনেক বিখ্যাত কাব্য বা গল্প রচিত হয়েছে স্বপ্নে পাওয়া সূত্র মাধ্যম থেকে।বহু বিখ্যাত সঙ্গীত সুর-সৃষ্টির ধারা সম্ভব হয়েছে স্বপ্ন মাধ্যম থেকেই। আবার অনাগত ভবিষ্যত সম্বন্ধে ধারণা হয়েছে অনেকক্ষেত্রেই স্বপ্ন মাধ্যমে।

তবে গণিতের প্রতি অদম্য ভালোবাসার এক অদ্ভুত নিদর্শন ঘটে রামানুজনের মাত্র এগার বছর বয়েসেই, – এক জনের কাছ থেকে ‘অ্যাডভান্সড ত্রিগোনোমেট্রি’ বইটি সংগ্রহ করেন। মাত্র তেরো বছর বয়েসে অধ্যাপক লোনির লেখা এই বইটি ‘অ্যাডভান্সড ত্রিকোনোমেট্রি’ পুরোপুরি শেষ করে ফেলেন এবং নিজে তাতে কিছু নতুন নিয়ম সংযোজন করেন। আবার লাইব্রেরী থেকে বিভিন্ন গণিত বই এর সাথে জর্জ শুব্রিজকরের লেখা বই এক বন্ধুর কাছ থেকে পান। এটি ছিল এক বিখ্যাত বই…‘A synopsis of Elementary Results in pure and Applied Mathematics’ –প্রায় পাঁচ হাজার সূত্র এবং উপপাদ্য সম্বলিত যা রামানুজনকে গণিতের এক মহানপ্রেমী হতে এবং গণিত বিশেষজ্ঞ হতে সহায়তা করে। তবে যাঁর ভূমিকা রামানুজনের জীবনের চালিকাশক্তি তিনি অধ্যাপক হার্ডি। রামানুজনের জীবনীকার ‘সুরেশ রাম’ বলেন,… ‘দুজন (হার্ডি-রামানুজন) নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক এমন এক সম্পর্ক গড়ে তোলেন যা গণিতের জগতে তুলনারহিত। তবে এই সম্পর্ক উভয়েই অমর করে রেখেছে।’

গণিতজ্ঞ রামানুজনের জীবনকাহিনী কেবলমাত্র একজন ব্যক্তির নয় বরং ‘A story of two men’ গণিত ইতিহাসে হার্ডি রামানুজন Combination যেন ‘একই বৃন্তে দুটি কুসুম’। দুজনেই বিশুদ্ধ গণিত সাধক, চারিত্রিক মিল এবং অমিল নিয়েই দুজন দুজনকে সঠিকভাবে চিনেছিলেন, বাড়িয়ে দিয়েছিলেন হাত পরমবন্ধু, চিরশুভার্থী,একান্ত হিতৈষী হিসাবে পরস্পরকে। অথচ দুজনের (হার্ডি-রামানুজন) পরিচয় ঘটেছিল এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক চিঠির মাধ্যমে- সেও এক রোমাঞ্চকর গল্পগাথা…. 

১৯১২ সালের শেষ পর্বে এবং ১৯১৩ সালের শুরুর দিকে রামানুজন বিভিন্ন বিশিষ্ট গণিতবিদদের সাথে যোগাযোগ করার প্রচেষ্টায় চিঠি লিখতেন এবং চিঠির সাথে নিজের গবেষণালব্ধ বিভিন্ন কাজের নমুনাও জুড়ে দিতেন। শুভানুধ্যায়ীদের পরামর্শে তিনি লণ্ডন ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটির প্রাক্তন সভাপতি, এফ্ আর এস্ গণিতজ্ঞ এইচ.এফ.বেকার (H.F. Baker) এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের Salderian চেয়ারের অধিকারী অধ্যাপক ই.ডব্লু. হবসন (E.W.Hobson) কে।

কিন্তু দুবারেই তিনি কোনরকম সাড়া পাননি। অবশেষে কেমব্রিজের আর এক প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ হ্যারল্ড হার্ডি (Godfrey Harold Hardy) কে  লেখেন এক ঐতিহাসিক চিঠি, যা গণিত ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ – “This letter is one of the most important and exciting mathematical letters ever written”

চিঠির শুরুটি বিষ্ময় জাগায় – ‘I beg to introduce myself to you as a clerk in the Accounts Department of the port trust office at madras’..চিঠির সাথে পাঠালেন প্রমান বা ব্যাখ্যা ছাড়া প্রায় ১২০টি উপপাদ্য যা তাঁর নিজস্ব গবেষণালব্ধ সূত্র যা পরবর্তীকালে বহুজনেই ‘A collection of amazing results’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন।

হার্ডি তাঁর প্রাতঃরাশ টেবিলে অন্যান্য চিঠিগুলির সাথে এই চিঠিটিও পেলেন যা তাঁর মতে ‘A large untidy envelop decorated with Indian Stamps’।হার্ডি পড়ে বিরক্ত হয়ে ভাবলেন ‘A curious kind of fraud’। বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়েই রুটিনমাফিক কাজ করতে থাকেন- কিন্তু সন্ধ্যেবেলায় হার্ডি, ভেতরে ভেতরে কেমন যেন আনমনা অস্থির হতে থাকেন- মনের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয় হার্ডির, যেন হাজারো প্রশ্নে মন জর্জরিত ‘Is a fraud of genius more probable than an unknown mathematician of genius?’

আসলে হার্ডি শুধুই গণিতজ্ঞ হিসাবে বড় ছিলেন না – গণিতের বাইরে বিভিন্ন চমৎকার নিবন্ধ লিখতেন। ‘অ্যাসথেটিক্স অফ্ ম্যাথমেটিকস্’, ‘ম্যাথমেটিসিয়ানস্ অ্যাপোলজি’ – অসাধারণ দুই বই এর লেখক তিনি। হার্ডি ছিলেন অন্য ধাতের, অন্য ধরণের, অন্য জাতের গণিতজ্ঞ – যিনি পরীক্ষা ছাড়া কোন কিছুকে মেনে নিতেন না। হয়ত বা  অলক্ষ্যে ঈশ্বর হাসছিলেন – রামানুজনের সাথে ভবিষ্যতে হার্ডির আত্মিক যোগাযোগ ভবিতব্যই হয়ত নিজের অজান্তেই হার্ডিকে তীব্র আকর্ষণ জাগিয়েছিল এই ঐতিহাসিক চিঠির প্রতি।

এরপর রাত্রি ন’টার সময় বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ জে.ই.লিটলউড এবং অধ্যাপক গণিতজ্ঞ হার্ডি- দুজনেই উপপাদ্যগুলির বিচার বিশ্লেষণে মহাব্যস্ত – যতই দুজনে উপপাদ্যগুলি দেখছেন, ততই উৎফুল্ল, বিমোহিত হয়ে পড়ছেন। ‘The more they looked the more dazzled they become.’ মধ্যরাত্রে তাঁরা সহমত হলেন, ‘The writer of manuscripts is a man of genius’. ঐ সময়ে কেমব্রিজের গণিত পরিবেষ্টিত মহামণ্ডলে এই ঐতিহাসিক চিঠি নিয়ে হৈ হৈ পড়ে যায় ‘No one can forgot the sensation caused by this letter’.

এরপর তো ইতিহাস – ১৯১৪ সালে ১৭ই মার্চ কেমব্রিজ যাত্রা করলেন রামানুজন। হার্ডি রামানুজন  সৃজনশীলতায় গণিত সমৃদ্ধ হতে থাকে তাঁদের ‘Intellectual Companionship’ এর দ্বারা। ১৯১৫ সালে তাঁর ৯টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ প্রায়। ইংল্যাণ্ডে থাকাকালীন রামানুজনের ২১টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সারাজীবনভর গণিতজ্ঞ রামানুজনের মোট ৩৭টি গবেষণাপত্রের মধ্যে অধ্যাপক হার্ডির সাথে যৌথভাবে ৭টি গণিত গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়।

গল্পগাথা বা উপকথার মতো রমনীয় রোমাঞ্চকর হল হার্ডি–রামানুজন ‘Strong Bonding’, অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রামানুজন – অধ্যাপক হার্ডি তাঁকে দেখতে এসে বললেন, যে গাড়িতে তিনি এলেন তাঁর নম্বর ১৭২৯ যা ‘Seemed to me rather a dull one’। 

হাসপাতালের বেডে শুয়েও অদ্ভুত উদ্ভাসিত আলোকে রামানুজনের চোখদুটো জ্বলে উঠল প্রজ্ঞায়, বললেন ১৭২৯ সংখ্যাটি অনন্য – এটি এমন একটি ক্ষুদ্রতম সংখ্যা যে, যা দুটি ভিন্ন সংখ্যার ঘনের যোগফল হিসেবে

১৭২৯ = (১০) + (৯) = (১২) + (১)

অদ্ভুত গণিতপ্রেম দুই ভিন্ন চরিত্রের গণিতজ্ঞকে অদ্ভুত বাঁধনে বেঁধে রেখেছিল। শুধু ‘Subject’ এর প্রেম দুই ভিন্ন দেশের মানুষের জীবনে এক অদ্ভুত ভালবাসা, শ্রদ্ধা বন্ধন সূষ্টি করেছিল তা আজও বিষ্ময়কর।

রচনাসূত্র (References):

১) কিছু বিজ্ঞানী কিছু বিজ্ঞান কথা-সত্যবাচী সর

২) অ্যারিস্টটল থেকে স্টিফেন হকিং-শ্যামল চক্রবর্তী

৩) কেন?–সমীরকুমার ঘোষ

৪) ভারতীয় গণিতের সপ্তরথী-সত্যবাচী সর

৫) গণিত জগতের বিষ্ময় রামানুজন-সত্যবাচী সর

৬) বিজ্ঞান ও দর্শন-ব্রেকথ্রু সায়েন্স সোসাইটি

৭) বয়ঃসন্ধির দোরগোড়ায়-নীরজা শর্মা

৮) বিজ্ঞান সাহিত্যের স্বরূপ সন্ধানে-নন্দলাল মাইতি

৯) নানা নামে সংখ্যা-সত্যবাচী সর

১০) নানান ভাবনায় গণিত-সত্যবাচী সর

১১) প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতীয় গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা-নলিনীকান্ত চক্রবর্তী

লেখিকা: অনিন্দিতা মাইতি নন্দী
Loading...

চাক‌রির খবর

ভ্রমণ

হেঁসেল

    জানা অজানা

    সাহিত্য / কবিতা

    সম্পাদকীয়


    ফেসবুক আপডেট