।। প্রেমের আঘাতে আত্মঘাতী হলে, মারীর দুবার নোবেল জয় হতো না ।।


বৃহস্পতিবার,২৪/০৯/২০২০
2847

।। প্রেমের আঘাতে আত্মঘাতী হলে, মারীর দুবার নোবেল জয় হতো না ।।

অনিন্দিতা মাইতি নন্দী : প্রাচীনকাল থেকেই বিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়েছিল।বিজ্ঞানের অগ্রগতির ইতিহাসে এই মহান বৈজ্ঞানিকদের সাধনা ও গবেষণার পথ ছিল কণ্টকময়, বিজ্ঞানের বর্তমান পর্যায়ে আসতে সভ্যতার অগ্রগতিতে এই বিজ্ঞান তপস্বীদের অনেক আত্মত্যাগ, যন্ত্রনা এমন কি নিজের জীবন পর্যন্ত বলি দিতে হয়েছে। এমনই এক বিজ্ঞান সাধিকা মাদাম কুরি যার বিজ্ঞান সাধনার অন্যতম লক্ষ্য মানব সমাজের কল্যাণ, মানব সভ্যতার উন্নতি, মানুষকে ব্যথামুক্ত জীবন দিতে গিয়ে নিজেই অবর্ণনীয় ব্যাথা সহ্য করেছিলেন।

মাদাম কুরি হলেন প্রথম নোবেল জয়ী মহিলা বিজ্ঞানী, আবার সেই সঙ্গে তিনি প্রথম বিজ্ঞানী যিনি দুবার নোবেল বিজয়ী। ওয়ার (Warsaw) শহরে এক বিজ্ঞান শিক্ষকের পরিবারে ১৮৬৭ খ্রি: ৭ই নভেম্বর জন্ম নেন এক বিরল প্রতিভার অধিকারী মারী স্কলোদায়স্কা (মাদাম কুরি),- পোলান্ডে তাঁর জন্ম, অথচ পোলেরা তখন স্বাধীনতা হারিয়েছে, রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত তখন ওয়ারশ। এই সময় পোলান্ড ছিল জার্শাসিত, তাই অত্যাচারী শাসক দের হাতে নির্যাতিত হতেন দেশের সাধারণমানুষ।

মারীর বাবা ছিলেন একজন শিক্ষক, মা ও ছিলেন প্রধান শিক্ষিকা। তাই বাড়িতে লেখাপড়ার একটি আবহ ছিল সব সময়। তবে শৈশবে অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় মারিকে, মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁর মা যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর কিছুদিন পর বড়বোন জোশিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এলোমেলো হয়ে যায় তাঁদের পারিবারিক জীবন। অসম্ভব মেধাবী মারী, স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় স্বর্ণপদক লাভ করেন ১৮৮৩ খ্রি:। উচ্চ শিক্ষার প্রতি অদম্য আকর্ষণে বহুদূরে পারী শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন মারী ও তার বোন। তাঁর বাবা মেয়েদের এই উচ্চ শিখায় সম্মতি জানালেও অর্থসঙ্কটের কারণে প্রথমে বিদেশে শিক্ষালাভ করতে গেলেন মারীর বড়বোন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে মারী এক ধনী পরিবাবের গৃহশিক্ষকতায় যুক্ত হন। পরে তিনি গভর্নেসের চাকরি নেন অন্য একটি বাড়িতে। প্রায় তিন বছর এই চাকরি করেন এবং কিছু টাকা সঞ্চয় করেন। আর এখানেই তাঁর জীবনে আসেন এক স্বপ্নের রাজকুমার, কাজিমিয়েরেজ জোরভস্কি। নিয়তির বিধানে এই সম্পর্কে আঘাত পান মারী। তাই এই নিদারুন মর্মবেদনায় তিনি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন, ভেবেছিলেন, “এই ঘৃণিত পৃথিবী থেকে আমি বিদায় নিলে ক্ষতি খুব সামান্যই হবে।

পারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার সুযোগ পান মারী, তার বড়বোন ব্রনিয়া বিদেশে যাবার প্রায় ৭ বছর পর। নিজের কিছু জমানো টাকা আর বোন ব্রনিয়ার উপর ভরসা করে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৮৯১ সালে দিদি ব্রনিয়ার উৎসাহে মাদাম কুরি প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় সরবনে পড়তে গেলেন। দিদি ব্রনিয়া বিয়ে করেছিলেন বিদেশে, তাই প্রথম দিকে মারী, দিদির বাড়ি থেকেই পড়াশুনো শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে পড়াশুনার কারণে ১৮৯২ খ্রি: বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ল্যাটিন পাড়ায় চলে আসেন। ওখানে দরিদ্র ছাত্রছাত্রীরা কষ্ট করে থাকে। মারী থাকেন ৭ তলায় একটি ছোট্ট কামরায়। সব কাজ নিজেকেই করতে হতো। একদিকে টিউশনি করে অর্থ উপার্জন করা, অন্য দিকে পড়াশুনো। রাত দশটা অব্দি লাইব্রেরিতে পড়াশুনো করেন। গভীর রাত অব্দি বাড়িতে কঠোর অধ্যবসায়, ফলেমারীসম্মানেরসাথেসমস্তপরীক্ষায়উত্তীর্নহলেন।পদার্থ বিদ্যায় মাস্টার ডিগ্রী পেলেন প্রথমহয়ে।আবার পরের বছরই গণিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করলেন।

এ যেন এক রূপকথার গল্প, যে মেয়েটি , ১৮৯১ সালে মাত্র জমানো ২০ ডলার ($) নিয়ে বিদেশ যাত্রা করলেন উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য, চরম দারিদ্রের সাথে লড়াই করে, কঠোর পরিশ্রম করে, নিদ্রাহীন, ক্লান্তিহীনভাবে ডিগ্রী লাভের স্বপ্নপূরণ করেন অদম্য মানসিক জোরে। মুগ্ধ হয়ে শুনতেন এডমন্ডবাউটি, পল আপ্পেল, গাব্রিয়েল লিপম্যানদের মতো বিশিষ্ট মানুষদের বক্তৃতা। এখানেই মারী সাক্ষাৎ পান জ্যা পেরিন, এইম কটন, চার্লস  মউরেনদের মতো পদার্থবিদদের। পদার্থবিদ্যায় ডিগ্রী লাভের পর একটি কাজ জোগাড় করে নিলেন অধ্যাপক গাব্রিয়েল লিপম্যানের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ল্যাবরেটরিতে।

পরবর্তীকালে মারী কুরি বলেন, “পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের উপর রচিত প্রবন্ধগুলি থেকে আমি নানারকম পরীক্ষা করতে চেষ্টা করতাম। কখনও কখনও আশাতিরিক্ত সফলতায় মন উৎসাহিত হয়ে উঠত, আবার কখনও অভিজ্ঞতার অভাবে দুর্ঘটনা ঘটে যেত। কখনও নিরাশায় মন ভেঙে পড়ত, মোটকথা, এখানে কাজ করতে করতে একটা কথা শিখলাম যে, এসব ক্ষেত্রে খুব দ্রুত, খুব সহজে সফলতা আসেনা। তবু আমার এই প্রচেষ্টাগুলো থেকে পরীক্ষামূলক গবেষণার প্রতি আমার আকর্ষণ জন্মালো।

১৮৯৩ সালে মাদাম কুরির পরিচয় ঘটে প্রখ্যাত অধ্যাপক পিয়ের কুরির সাথে। সেই সময় পিয়ের কুরি ছিলেন প্যারিসের স্কুল অফ ফিজিক্স এন্ড কেমিস্ট্রি (ESPCI)-র ইন্সট্রাক্টর, ক্রিস্টালোগ্রাফি, ম্যাগ্নেটিজম এবং পিজো ইলেক্ট্রিসিটি বিষয়ে গবেষণা করে তখন যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি।

তিনি কেলাস কঠিন নানা বস্তুর পরীক্ষা নিয়ে মেতে ছিলেন তখন। আবার তাপের পরিবর্তনে কেলাসে চৌম্বক ক্ষেত্রের রূপান্তরের বিষয়ে মৌলিক সূত্র আবিষ্কার করেন যা কুরি নিয়ম বলে প্রসিদ্ধ। পিয়ের ও তাঁর দাদা জ্যাক কুরি সেইসময় গবেষণাগারে Piezoelectricity Quartz আবিষ্কার করেন। পদার্থবিদ ভিয়েরাস ,-মারীর সাথে পরিচয় ঘটান পিয়ের কুরির। মারীকে পিয়ের তাঁর ল্যাবরেটরিতে কিছুটা জায়গা ছেড়ে দিলেন গবেষণার কাজে। তেজস্বিনী, বুদ্ধিমতী মারীর আকর্ষণ ক্রমশ গাঢ় বন্ধুত্বে পরিণত হল। দুজনেরই গবেষনার প্রতি আগ্রহ প্রবল বিজ্ঞানের প্রতি অসম্ভব আগ্রহই দুটি মানুষের মধ্যে অদৃশ্য দূরত্বকে ক্রমশই কমিয়ে আনল পাশাপাশি।

মারীর উৎসাহে ১৫ বছর ধরে ছড়ানো মৌলিক কার্যের বিবরণগুলি একত্রিত করে পিয়ের থিসিস পেশ করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মান ডক্টরেট পাওয়ার প্রত্যাশায়। অবশেষে পিয়ের ডক্টর উপাধি পেলেন। মারী, পিয়েরের বিবাহ প্রস্তাবে সাড়া দেন। অবশেষে ২৬শে জুলাই, ১৮৯৫ পিয়ের ও মারী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মারী থেকে হয়ে ওঠেন মাদাম কুরি। এবার শুরু হলো সাংসারিক জীবন, সাথে বিজ্ঞানচর্চার সাধনা। মাদাম কুরি বিশেষ এক কাজের দায়িত্ব নিয়েছেন লিপম্যানের ল্যাবরেটরিতে। নানা প্রকার ইস্পাতে চৌম্বক ধর্মের তারতম্য ও তার ফল নিয়ে প্রকাশিত হল বুলেটিন। তখন তিনি এক কন্যা সন্তানের মা। জন্ম নিয়েছেন কন্যা ইরেন (পরে ইনি ও নোবেল বিজয়ী)। পরে ১৮৯৬ সালে মাদাম কুরি প্রথম হয়ে ফেলোশিপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

সংসার সন্তান, সবই তো হল, এবার মারীর মন কেমন করে, স্বপ্নবিভোর হয়ে থাকেন কোন ভালো কিছু গবেষণার প্রতীক্ষায়। উপযুক্ত কোন বিষয় নির্বাচন করে গবেষণায় মগ্ন হতে হবে। স্বামীর সাথে দিবারাত্র আলোচনায় আবদ্ধ তিনি, অনুসন্ধানী পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছেন আপনমনে: কিন্ত এইবার ভবিতব্য তাঁকে তাঁর প্রধান অবদানের দিকে অলক্ষে নিয়ে গেল। ১৯৯৫ সালে প্রফে: রঞ্জেন আবিষ্কার করেন X-রশ্মি। বায়ুশূন্য কাচের গোলকে প্রোথিত ২টি ধাতু দণ্ডের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎপ্রবাহ পাঠানোর চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। গোলকের কাচ পীতাভ আভায় স্ফুরিত হচ্ছে, এক অদৃশ্য রশ্মি ছড়াচ্ছে চারিদিকে। ফরাসি বিজ্ঞানী Henri Becquerel ভাবলেন, এই অদৃশ্য X-রশ্মির সাথে কাচের পীতাভ স্ফুরণের কোন সম্পর্ক আছে কিনা। ইউরেনিয়াম ধাতু ঘটিত কাচ থেকে সূর্যের আলো পড়লে এইরকম পীতাভ স্ফুরণ দেখা যায়। এইবার তিনি ইউরেনিয়াম নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেন, সূর্যের আলো ছাড়াই ইউরেনিয়াম এক নতুন ধরণের আলোক রশ্মি বিকিরণ করছে।

বিজ্ঞানী Becquerel ইউরেনিয়ামের বিভিন্ন যৌগ নিয়ে পরীক্ষা করলেন এবং দেখলেন যে অন্ধকারে এইসব দ্রব্য থেকে এক অদৃশ্য বিকিরণ হয়। এর সব ধর্মগুলি ঠিক বিজ্ঞানী রঞ্জেনের X-রশ্মির মতো। তিনি এই নতুন রশ্মির নাম রাখেন বেকরেল (Becquerel) রশ্মি। তিনি বুঝলেন যে ইউরেনিয়ামের নিজস্ব গুনের মাধ্যমেই এমন হচ্ছে। এই সমস্ত পরীক্ষার ফল ১৮৯৬ সালে প্রকাশ করেছিলেন বেকারেল। তখনও ইউরোপ ও অন্যান্য জায়গায় ইউরেনিয়াম রশ্মির দিকে সেভাবে নজর পড়েনি। মারী কুরিকে এই সম্পূর্ণ অজানা পথের নব আবিষ্কার যেন প্রবল আকর্ষণে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিল নতুন পথের সন্ধানে।

মাদাম কুরি রীতিমতো উৎসাহী হয়ে পড়েন এই ইউরেনিয়ামের যৌগ নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে। কিন্ত এই পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানোর জন্য উপযুক্ত স্বতন্ত্র স্থানের প্রয়োজন। শেষ অব্দি অনেক সাধ্য সাধনায় স্কুল অফ মেডিসিনের একটি পরিত্যক্ত মর্গ, যা আসলে একটি ভাঙাচোরা অপরিছন্ন শেড মাত্র তা পেলেন। কিন্ত এই কুরি দম্পতি দমে যাবার পাত্র নয়, সবকিছু নিজের খরচে গুছিয়ে এই সেডটিকে ল্যাবরেটরি মনে করে গবেষণা শুরু করেন। ঘর স্যাঁতস্যাতে Electrometer বা Electroscope –এ কাজ করা দুঃসাধ্য, পরিবেশ অস্বাস্থকর তবু কাজ অতি দ্রুত এগিয়ে চলল। ইউরেনিয়ামের সব যৌগ থেকেই রশ্মি নির্গত হচ্ছে প্রমাণিত হল। মারী দেখলেন বিকিরণের পরিমান যৌগে ইউরেনিয়ামের পরিমানের উপর নির্ভর করে। সুতরাং বিকিরণ মৌলের পারমাণবিক ধর্মের উপর নির্ভরশীল। মারী ভাবলেন যে অন্যান্য ধাতু থেকেও কি এই ধরণের অদৃশ্য বিকিরণ হয়? দেখা গেল ইউরেনিয়াম ছাড়া কেবলমাত্র থোরিয়াম এই গুনের অধিকারী। তাই থোরিয়ামের যৌগগুলিরও পরীক্ষা হল, এখানেও বিকিরণের পরিমান যৌগে থোরিয়ামের পরিমানের সমানুপাতিক। মাদাম কুরির এই বিকিরণ রশ্মির ক্ষমতার নাম দিলেন রেডিওএক্টিভিটি বা তেজস্ক্রিয়তা (রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ)

মাসের পর মাস পরীক্ষা করার পর , একটি সুস্পষ্ট ধারণা বদ্ধমূল হল, যে পরমাণু স্বভাবগুনে তেজস্ক্রিয় সেটি সকল অবস্থাতেই ওই শক্তি প্রকাশ করবে এবং এই বিকিরণ শক্তি ক্রিয়ার ফল পরমাণুর সংখ্যার সমানুপাতিক। মারী বিশুদ্ধ যৌগ ছেড়ে বিভিন্ন রকম প্রস্তর খণ্ড নিয়ে পরীক্ষা শুরু করলেন। প্রথমদিকে আশানুরূপ ফল পাচ্ছিলেন, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম প্রস্তরখন্ডে না থাকলে তেজস্ক্রিয়তা দেখা যাচ্ছিলনা। তবে পরে একটি অদ্ভুত বিভ্রমের সৃষ্টি হল, Pitchblende বা Chalcolite এর মধ্যে ইউরেনিয়াম আছে, তবে তেজস্ক্রিয়তার পরিমান অনেক বেশি শক্তিশালী। বারংবার পরীক্ষা করে একই ফল আসে। বিভিন্ন স্থান থেকে মারী প্রস্তর সংগ্রহ করেন এবং বহুবার পরীক্ষা করেও একই ফল পান। Pitchblende –এ যে তেজস্ক্রিয়তার পরিমান তা ইউরেনিয়ামের থেকে প্রায় ৪ গুন। মারী ইলেক্ট্রোমিটার যন্ত্রের সাহায্যে দেখেন ইউরেনিয়াম থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় বিকিরণ চারপাশের বায়ুকে আয়নিত করে। আবার এটাও প্রমান করেন ইউরেনিয়াম যৌগে ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা নির্ভর করে ইউরেনিয়ামের পরিমানের উপর এবং পরমাণুর  স্বতঃস্ফূর্ত ভাঙ্গনের ফলেই তেজস্ক্রিয়তা দেখা যায়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল বিশুদ্ধ ইউরেনিয়ামের তুলনায় পিচব্লেন্ড চারগুন বেশী, চারকোলাইট দুই গুন বেশী তেজস্ক্রিয়তা দেখায়। এর কারন ভাবতে অনেক চিন্তার পর মারী সিদ্ধান্ত নিলেন পিচব্লেন্ডএ অবশ্যই কোনো অজানা বস্তু রয়েছে যা আগে পরীক্ষায় ধরা পড়েনি। এবার মারী প্রবন্ধে প্রকাশ করলেন সেই অজানা বস্তুর উপস্থিতি পিচব্লেন্ডএ। ১৮৯৮ সালে এই পিচব্লেন্ডএর অসাধারণ তেজস্ক্রিয়তার কথা প্রকাশিত হবার পর মারীর সাথে পিয়ের কুরি যুগ্মভাবে গবেষণা শুরু করলেন। এই গবেষণার জন্য উপযুক্ত ল্যাবরেটরি ও পর্যাপ্ত পরিমান পিচব্লেন্ড প্রয়োজন। কিন্তু এই মূল্যবান খনিজ পদার্থ একমাত্র অস্ট্রিয়াতে পাওয়া যায়। অনেক চেষ্টা চরিত্রের ফলে পাওয়া গেলো কিছু পরিমান পিচব্লেন্ড। কিন্তু গবেষণাগার একটি অপরিচ্ছন্ন শেড মাত্র। এই শেডটিতে আবার শীতে বরফের চাঁই, আর বর্ষার ছাদ  থেকে জল পড়ে, শেডটি জ্বলন্ত উনুনে পরিণত হয় গ্রীষ্মে। এমন অদ্ভুত ল্যাবরেটরি দেখে রসায়নবিদ ভিলহেমস বিস্মিত হয়ে বলেন, “এখানে ল্যাবরেটরি কোথায়? এ যে আস্তাবল ও আলু গুদামের সংমিশ্রণ।তবু কুরি দম্পতি পরম মমতায় ওই ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত শেডটিকে ল্যাবরেটরি বানিয়ে, চূড়ান্ত প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে গবেষণায় নিমগ্ন হয়ে থাকতেন।

১৮৯৯ সালে মারী পেলেন বস্তাভর্তি পিচব্লেন্ড। বস্তা যাতে বৃষ্টিতে না ভেজে তাই রুগ্ন মারী বস্তাগুলোকে প্রথমেই ঝাড়াই করা, বাছাই করা, ছাঁকার কাজ অসীম আগ্রহে করতে লাগলেন। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে মারী  একা পরম নিমগ্ন, অসীম আগ্রহে বড় বড় কড়াইতে জ্বাল দিয়ে দ্রবণ করেছেন লোহার রডের সাহায্যে নাড়িয়ে। দ্রবণটি থিতিয়ে গেলে, থিতানো অংশটি আলাদা করে আবার দ্রবণ তৈরী করছেন কেলাস তৈরির জন্যে, তা আবার পুনকেলাসিত (Recrystalisation) করেছেন। বিরামহীন, বিরক্তিহীন ভাবে অমানুষিক পরিশ্রম করে চলেছেন। পরীক্ষাটিতে বিশুদ্ধিকরণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে H2S(হাইড্রোজেন সালফাইড) বিষাক্ত গ্যাস। ফুটন্ত কড়াই থেকেও বের হতো বিষাক্ত ধোঁয়া। এর থেকে নিজেদের বাঁচাবার জন্যে কোন সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। মারীর ঢিলেঢালা পোশাক, ধুলো বালি, অ্যাসিড এর দাগে ভর্তি, কখনো বা পোশাকে ফুটো হয়ে যেত, ঠোঁটে বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাব ছাপ ফেলেছে। ১৯০০ সালে জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, কুরিদের শেডল্যাব ও তাঁদের দুরবস্থা দেখে তৎক্ষণাৎ সুইজারল্যান্ডে এসে গবেষণার জন্য প্রস্তাব দেন।কিন্তু গবেষণার ক্ষতি হতে পারে ভেবেই কুরি দম্পতি এই প্রস্তাব উপেক্ষা করেন।

এই সময় মারী একটি মহিলা কলেজে আংশিক সময়ের অধ্যাপিকা হিসেবে পদার্থবিদ্যায় যোগদান করেন। তবে সেখানে ছাত্রীরা তাঁকে অপছন্দ করেন কারণ মারীর পরনে অতি সাধারণ পোশাক, ফরাসি উচ্চারণে তাঁরপোলিশ উচ্চারণের প্রভাব। ক্লাস নেওয়া, ল্যাবে অমানুষিক পরিশ্রমের পরেও বাড়িতে এসে কন্যা ইরিনের যত্ন নিতেন। কোন কোন গভীর রাতে স্বামী পিয়েরকে নিয়ে জরাজীর্ন সেই পুরানো শেডল্যাবে ফিরে কাজ শুরু করতেন। একটানা দুই বছর কঠোর পরিশ্রমের পর তাঁরা আবিষ্কার করলেনবিসমাথযৌগিক উপাদান। আরবিসমাথকে আরও শোধন করতে গিয়েই পেয়ে যান কাঙ্খিত বস্তু। 

একদিন রাত্রে মারী শেডল্যাবে ঢুকেই আশ্চর্য হলেন। স্বামী পিয়ের কুরিকে আলো জ্বালতে বারণ করেন,কারণ তিনি একটি বোতলের দিকে তাকিয়ে দেখেন ওখানে একটি ছোট্ট নীল আলো বেরিয়ে আসছে যার উৎস সামান্য পরিমান রেডিয়াম। এই নীল আলোতে বইও পড়া যায়।১৮৯৮ সালের জুলাই মাসে কুরিদম্পতি তাঁদের নতুন আবিষ্কারের কথা ঘোষণাকরেন।

মারী কুরি পিচব্লেন্ড থেকে প্রথম তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়াম আহরণ করেন। এর তেজস্ক্রিয়তা ইউরেনিয়ামের চেয়ে ৪০০ গুন বেশী। মাতৃভূমি পোল্যান্ডের কথা স্মরণ করে এই দুই বিজ্ঞানী নাম রাখেন পোলোনিয়াম (Poloniam)।১৯০০ সালে ক্ষারধর্মী এক নতুন মৌলের সন্ধান পেলেন তারা, পিচব্লেন্ডে যার ব্যবহার বেরিয়ামের মতো, নাম রাখলেন রেডিয়াম। এই রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা ইউরেনিয়ামের থেকে প্রায় ১০ লক্ষ গুন বেশী। আবার এক টন পিচব্লেন্ড, পঞ্চাশ টন জল আর ছয় টন রাসায়নিক পদার্থ শোধন করলে মাত্র এক গ্রেন পরিমান রেডিয়াম পাওয়া যেতে পারে।

১৯০০ সালে আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত হল আন্তর্জাতিক পদার্থবিদ্যা কংগ্রেস প্যারিস শহরে। এখানে কুরি দম্পতি একটি প্রদর্শনীতে তেজস্ক্রিয়তা ও রেডিয়াম সংক্রান্ত গবেষণা সকলের সামনে তুলে ধরেন। ফলে দুই নতুন মৌলের আবিষ্কারের কথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। বিশ্বের বিজ্ঞানীদের কাছে কুরিদের একটি বিশেষ স্থান মর্যাদা পেল। তবু বিতর্কের শেষ নাই। কেমিস্টরা বললেন, এই নব মৌল গুলির বিশুদ্ধ যৌগ তৈরী হওয়া দরকার, নইলে মৌলাঙ্ক জানা দরকার। রেডিয়ামকে রাসায়নিক মৌল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে অবশ্যই তার পারমাণবিক ওজন জানা দরকার।

এইবার কুরিদের কাছে উপস্থিত নতুন সমস্যা। এতদিন গবেষণার সমস্ত খরচ তাঁরা নিজেরাই বহন করছেন। এখন নতুন ধাতব মৌলকে বিশুদ্ধ অবস্থায় Pitchblende থেকে নিষ্কাশন খুবই ব্যায়বহুল। ভাগ্যদেবীর সহায়তায় সন্ধান পেলেন ব্যাভেরিয়ায় পিচব্লেন্ড প্রচুর পরিমানে খনি থেকে তোলা হয়। ১৯০২ সালে সাইন্স একাডেমি থেকে পাওয়া সামান্য অর্থে পিচব্লেন্ড কিনে ,তা থেকে অনেক পরিশ্রমে প্রায় ১গ্রাম মতো রেডিয়াম পাওয়া গেল। কয়েক বছর অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রায় বিশুদ্ধ অবস্থায় রেডিয়াম যৌগ তৈরী করলেন তারা। শেষে মারী রেডিয়ামের পারমাববিক ওজন ২২৫.৯৩ বের করলেন।

আজকের পর্যায়সারণিতে (Periodic Table) তা ২২৬ এর খুব কাছাকাছি। এবার সন্দেহের নিরসন হল। সমগ্র বিশ্ব স্বীকার করে নিল রেডিয়ামের অস্তিত্ব। ফ্রান্সের বিজ্ঞানী পল ল্যাজভা এই আবিষ্কারকে তুলনা করেছেন মানুষের আগুনের শক্তি আবিষ্কারের সাথে। এই আবিষ্কার পদার্থ বিদ্যার জয়যাত্রার বিরাট সূচনা করে। রেডিয়াম আবিষ্কার পরমাণুর অবয়ব বুঝতে সাহায্য করে।

সারাবিশ্বে এই আবিষ্কার নিয়ে জয় জয়কার। ১৯০৩ সালে রেডিয়াম সম্পর্কিত বক্তৃতা দেওয়ার জন্য ইংল্যাংন্ডের রয়েল ইনস্টিটিউশন থেকে আমন্ত্রণ পেলেন কুরি দম্পতি। এখানে নভেম্বর মাসে রয়েল সোসাইটি তাঁদেরডেভি পদক’ –এ ভূষিত করে। ১৯০৩ সালেই হেনরী বেকারেল (Henri Becquerel) তত্বাবধানে মারী পদার্থবিদ্যায় ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন। গাব্রিয়েল লিপিমান ঘোষনা করলেন, “প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় তোমাকে ডক্টর অফ ফিজিক্যাল সাইন্স উপাধিতে ভূষিত করেছে। এর আগে কোন ডক্টোরেল থিসিসে এত বড়মানের বৈজ্ঞানিক অবদান দেখা যায় নি।এবং সেই বছরই মাদাম কুরি ও পিয়ের কুরি, বিজ্ঞানী বেকরেল একত্রে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

১৯০২০৩ সালে তখনও অজ্ঞাত ছিল নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটানোর পিছনের শক্তির স্বরূপ। সারা বিশ্বে তেজস্বীয়তার বিষয়ে গবেষণার কথা ছড়িয়ে গেলে, বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড ও সডি দুজনে প্রমান করেন রেডিয়াম থেকে হিলিয়াম উৎপত্তি কথা। তেজষ্ক্রিয় পরমাণু ভেঙেই রূপান্তরিত হচ্ছে, আর তাই তেজষ্ক্রিয়তার বিকাশ ঘটছেএটি রাদারফোর্ড প্রমাণ করে দেখলেন। আবিষ্কৃত হল বিশেষ নিয়মে পরমাণুর পরিমানের রূপান্তর ঘটেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেমন কানাডা, হল্যান্ড, জার্মানী, ইংল্যান্ড সর্বত্রই উৎসাহ ভরে কাজ চলতে লাগলো। এমত অবস্থায় পিয়ের ও মারী কুরি একসাথে কাজ করছেন, বিভিন্ন প্রবন্ধ লিখছেন, নানারকম নতুন তথ্য প্রদান করছেন। তাঁরা বলেন, রেডিয়াম থেকে বের হয় ইমানেশন গ্যাস যে রেডিয়ামের মতোই তেজষ্ক্রিয়। পিয়ের কুরি ১৪ই এপ্রিল ১৯০৬ সালে বলেন যে ইমানেশনের পরিমান মেপে তাঁরা চেষ্টা করছেন কতটা রেডিয়াম থেকে তার উৎপত্তি সেটা যদি জানা যায়।

এদিনে রেডিয়াম আবিষ্কারের পর কিছুজন ডাক্তার কুরি দম্পতির কাছ থেকে রেডিয়াম নিয়ে তা প্রয়োগ করলেন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী ও টিউমার রোগীদের উপর। তাঁরা ফলাফল ভালোই পেয়েছিলেন। রেডিয়াম নিয়ে এই সফল প্রয়োগ চিকিৎসাক্ষেত্রে এক নব দিগন্তের সূচনা করল, নাম হল কুরি থেরাপি। কুরি দম্পতি চাইলেই পেটেন্ট নিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন। কিন্তু মানবজাতির কল্যাণের জন্য, বিশ্বজনস্বার্থে বিজ্ঞানের তথ্য তাঁরা গোপন করেননি।

১৯০৬ সালে ১৯শে এপ্রিল সাংঘাতিক পথ দুর্ঘটনায় গাড়ীর তলায় চাপা পড়ে চিরতরে বিদায় নিলেন নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী পিয়ের কুরি। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। সাংঘাতিক মানসিক আঘাত পান মাদাম কুরি। তাঁর জীবনের অন্যতম প্রিয়বন্ধু, সাথী, সহযোদ্ধা বিজ্ঞানী আজ চিরতরে তাকে একাকী রেখে চলে গেলেন অনন্তধামে, বুঝি তেজস্ক্রিয়তার নব নব ধৰ্ম উদ্ভাবনের সন্ধানে। মারীর হৃদয় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, ফিরে যান স্মৃতিতে, অতীতের কাটানো পিয়েরের সাথে একসাথে কর্মযজ্ঞের দিনগুলিতে। মনে পড়ে যায় কথাচ্ছলে একদিন তিনি স্বামীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আচ্ছা একজন মরে যায়, তবে অপরে কি নিয়ে বেঁচে থাকবে? আমরা দুজনে কেউ যদি কাউকে হারাই।পিয়ের কিছুক্ষন নিরুত্তর থেকে অবশেষে বলেন, “বিজ্ঞানী নিজের কর্তব্য বা দায়িত্ব ভোলে না। জ্ঞানের পূজার তো ব্যাঘাত হবে না। যাইহোক কাজ করে যেতেই হবে।

তাই হলো শেষ অব্দি, তীব্র আঘাত ও নিঃসঙ্গতাকে সাথী করেই মারী তাঁর গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। ১৯০৬ সালের শেষ থেকে জীবনের বাকি পথটুকু একলা চললেন মারী। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার ভার নিয়ে পিয়েরের অসমাপ্ত বক্তৃতাগুলিকে কয়েকমাস বাদে উপসংহারের পথে নিয়ে গেলেন। ১৯১১ সালে একক ভাবে এবার রাসায়নবিদ্যাতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এবার তিনি পিচব্লেন্ড থেকে রেডিয়ামকে পৃথক করতে সমর্থ হয়েছিলেন। রসায়নে তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্মীকৃতি স্বরূপ এই নোবেল পুরস্কার। এরপর মাদাম কুরির নাম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছে।

পিচব্লেন্ড থেকে রেডিয়ামকে আলাদা করার জন্য Fractional Crystallysation পদ্বতি ব্যবহার মারীকে বীরের মর্যাদা দেয়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে, বিজ্ঞানের শিক্ষাজগতে তিনি ছিলেন অগ্রদূত, দুবার নোবেল, ১৫টি গোল্ড মেডেল, ১৯টি ডিগ্রী আরও বহু সম্মানের অধিকারিণী। ফরাসী সরকার মারীর আবেদনে সাড়া দিয়ে ১৯১৪ খ্রি: পারীতে তৈরী হয় Institute of Radium –তাঁর সব ভার মারী নিজের হাতে নেন, আর ২৭ বছর ধরে সুষ্ঠুভাবে সবকাজ চালাতে থাকেন। এই ইনস্টিটিউটে পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা ও চিকিৎসাবিদ্যা গবেষণা শুরু হয়। চারজন বিজ্ঞানী পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠান থেকে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন যাদের মধ্যে মাদাম কুরির কন্যা ইরেন কুরি (Irene Curie) ও জামাতা ফ্রেডরিক জোলিও (Frederic Joliot) ছিলেন।

১৯১৩ সালে নিজের মাতৃভূমি পোল্যান্ডের ওয়ারস শহরে একটি রেডিয়াম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। এর পর বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মারী গবেষণার কাজ ছেড়ে আর্তদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন, মেডিক্যাল সার্ভিসে যোগ দেন এবং ইউনিয়ন অব উইলেন অফ ফ্রান্স গঠন করেন। ১৯২১ সালে আমেরিকা সফর কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট মারীকে এক গ্রাম রেডিয়াম উপহার দেন। যুক্তরাষ্ট্র মহিলা সংগঠনও এক গ্রাম রেডিয়াম দেন। মারী এগুলো নিয়ে আসেন নিজের সাথে এবং ওয়ারশ হাসপাতালে চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিন তেজস্ক্রিয় রশ্মি বিকিরণের মধ্যে গবেষণা করতে করতে একটানা পরিশ্রমে, রেডিয়ামের অদৃশ্য রশ্মির তেজে অল্প অল্প করে মারীর জীবনীশক্তি ক্ষয় হতে থাকলো। যে দুটি মৌল তিনি আবিষ্কার করে বিশ্বজোড়া খ্যাতি পান সেই পোলোনিয়াম ও রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয় রশ্মি কামড় বসিয়েছিল  সারা দেহে, দিনের  পর  দিন তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছিলেন। আসলে ল্যাবরেটরিতে যখন পিচব্লেন্ড আসত, অনেক সময় প্রবল উত্তেজনায় মারী ইলেক্ট্রোমিটার নিয়ে সোজা পিচব্লেন্ডের মধ্যে হাত ভরে দিতেন, কোনরকম সুরক্ষা ছাড়াই। অনেক সময় নিজের ল্যাবরেটরি ড্রেসের পকেটেও ভরে রাখতেন তেজস্ক্রিয় পদার্থ ভর্তি টেস্টটিউব। তেজস্ক্রিয় আইসোটোপযুক্ত টেস্টটিউব পকেটে নিয়ে বা সংরক্ষণের জন্য ডেস্কের ড্রয়ার ব্যবহার করতেন। যদিও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই আবিষ্কার তাঁকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর দিকে আহ্বান করছে তবুও সব উপেক্ষা করে স্বাভাবিক ভাবেই তিনি গবেষণার কাজ চালিয়ে গেছেন।

অবশেষে মারীর শরীরে দুস্টুরোগ হানা দিল। আক্রান্ত হলেন এপ্লাস্টিক এনিমিয়া রোগে। তেজস্ক্রিয়তায় পুড়ে যাওয়া হাত ব্যান্ডেজ দিয়ে বাঁধা থাকত, হাত কাঁপত সবসময়। চোখের ছানি অপারেশনের জন্য দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে ঝাপসা হয়ে আসে। শরীর শীর্ন, জীর্ন ফ্যাকাশে। রেডিয়াম, পোলোনিয়াম শরীরের সব মেরুসার নিস্তেজ করে দিয়েছে। শ্বেত কণিকা কমে গেছে আর কোন নিস্তার নেই মারীর। রেডিয়াম আবিষ্কারের মূল্য চুকিয়ে গেলেন নিজের জীবন দিয়ে। রেখে গেলেন বিখ্যাত গ্রন্থ, “Radio Activita”. 

শারীরিক অবস্থার অবনতি শেষ হয় ১৯৩৪ সালে ৪ঠা জুলাই তাঁর অমরলোকে গমনের মধ্যদিয়ে। মৃত্যুর পর তাঁর ব্যবহৃত সমস্ত কিছু ফ্রান্সের একটি মিউজিয়ামে বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষিত হয়। মারীর মৃত্যর পর তাঁর দেহ কফিনটি ১ইঞ্চি পুরু সীসা দিয়ে আবৃত করা হয় যাতে শরীর থেকে কোন রকম তেজস্ক্রিয়তা না ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি মারী ব্যবহৃত ডায়েরি ও সবকিছু বিশেষ পদ্ধতিতেই সংরক্ষিত হবে আগামী ১৫০০ বছর অবধি। আলবার্ট আইনস্টাইনের কথায়, “মাদাম কুরি হয়ত পৃথিবীতে একমাত্র ব্যক্তি, যশ ও খ্যাতি তাঁকে কোনোদিন কলুষিত করতে পারেনি।

তাই আজ বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসে মাদাম কুরির মতো প্রতিভাময়ী বিরল। তাঁর চলমান গতিময় জীবনে আমাদের প্রণতি

চরণ বৈ মধু বিন্দতি চরণ স্বাধুমুদুস্বরম।

সূর্যস্য পশ্য শ্রেমানং যোগ তন্দ্রয়তে চরণ।

(চালাতেই মধু আছে, চলাই ডুমুর ফলসূর্যের দিকে তাকালে দেখা যায় সে তার চলা কখনোই থামায় না)

রচনা সূত্র :-

বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীরাসুনীল বন্দ্যোপাধ্যায় 

এ যুগের কিশোর বিজ্ঞানীপশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চ  (শারদসংখ্যা২০১৭)

মারী কুরির রেডিয়াম আবিষ্কারজনরঞ্জন গোস্বামী 

শতবর্ষ পরেমাদাম কুরির স্মরণেসত্যেন বোস  (শারদীয় জ্ঞান ও বিজ্ঞানঅক্টোবরনভেম্বর, ১৯৬৭)

জন্ম সার্ধ শতবর্ষে মেরী কুরিগোবিন্দ দাস  (এ যুগের কিশোর বিজ্ঞানীপশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চ, শারদসংখ্যা২০১৭)

মাদাম কুরি : এক অসামান্য বিজ্ঞানীঅংশুতোষ খাঁ  (জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার, শারদ সংকলন২০১৭

অনিন্দিতা মাইতি নন্দী

Loading...

চাক‌রির খবর

ভ্রমণ

হেঁসেল

জানা অজানা

সাহিত্য / কবিতা

সম্পাদকীয়


ফেসবুক আপডেট