গঙ্গাসাগর – যাওয়া, থাকা খাওয়া ও সমুদ্র


সোমবার,১১/০১/২০২১
7276

সুব্রত ঘোষ: আবার এসে গেল এক মকরসংক্রান্তির দিন, আর সেই সঙ্গেই গঙ্গাসাগরে পুণ্যস্নানের লগ্ন। “সব তীর্থ বারবার / গঙ্গাসাগর একবার” – গঙ্গাসাগরের কথা উঠলে এই প্রবাদটির কথাই প্রথমে মনে আসে। আবার ওই কয়েকটি কথার মধ্যেই তীর্থ হিসেবে গঙ্গাসাগরের বৈশিষ্ট্যের কথাই মনে পড়ে যায়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় কুম্ভমেলা হয় বারো বছরের ব্যবধানে, এবং সেগুলো সবই বিভিন্ন নদীকে ঘিরে। প্রয়াগ, হরিদ্বার, নাসিক, উজ্জয়িনী প্রভৃতি স্থানে গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী, গোদাবরী, শিপ্রা প্রভৃতি নদীতে স্নানের মধ্যে দিয়ে উদযাপিত হয় সেই মেলা । সেইসব স্নানের ক্ষেত্রে, বিভিন্ন দিনে একাধিক পবিত্র মুহূর্ত বা ক্ষণ থাকে, আর মেলাগুলিও চলে একমাসেরও বেশী সময় ধরে। পক্ষান্তরে, গঙ্গাসাগরের পুণ্যস্নানের ক্ষণ আসে প্রতিবছরেই এবং তা উদযাপিত হয় একটি তিথিতেই – তা হল মকর সংক্রান্তি। তা ছাড়া, কুম্ভমেলার স্থানগুলি সবই দেশের মূল ভূখণ্ডে, কিন্তু গঙ্গাসাগরের অবস্থান একটি দ্বীপে ।

বছরের ওই একটি দিনকে ঘিরে মোটামুটি এক সপ্তাহ গঙ্গাসাগর হয়ে ওঠে এক জনসমুদ্র, লক্ষ লক্ষ মানুষের জয়ধ্বনিতে মুখরিত এক পরম বিশ্বাসের তীর্থস্থল, কারণ তার প্রথম আর প্রধান পরিচয়ই এক মোক্ষদায়ী তীর্থের – যেখানে মকরসংক্রান্তির দিন স্নান করে কপিলমুনির মন্দিরে পুজো দিলে মেলে মোক্ষলাভের ভরসা। কিন্তু, ওই কয়েকটা দিন বাদ দিয়ে, বছরের বাকী সময়টায় এই সাগরসৈকতটি আপন মনে অনেকটা নির্জনেই পড়ে থাকে তার নিজস্ব সৌন্দর্য নিয়ে। সেখানে তখনও থাকে সেই একই সমুদ্র, একই বেলাভূমি, একই কপিলমুনির মন্দির। মেলার সময় প্রচণ্ড ভীড়ে যে সমুদ্রকে চেনা যায় না, যে কপিলমুনির আশ্রমে পা ফেলার জায়গা থাকে না, তাকে ঘিরে রাখতে হয় কঠিন বেড়া দিয়ে, সেই সাগর, সেই মন্দির – কিন্তু বছরের বাকী দিনগুলোয় একেবারেই নিরালা। গিয়েছিলাম – গঙ্গাসাগরের সেই নিৰ্জন সুন্দর রূপকেই প্রাণভরে উপলব্ধি করতে। তীর্থস্থান হিসেবেই এর পরিচয়, তাই সেইভাবে ট্যুরিস্টদের ভীড় যেমন নেই, তেমনই নেই তাদের থাকার সেরকম বিলাসবহুল বা আরামপ্রদ ব্যবস্থা। প্রাথমিক সুযোগ সুবিধাটুকুর সঙ্গে ভীড়হীন গঙ্গাসাগরের সে এক অন্য রূপ, মেলার সময়ের সঙ্গে যাকে ঠিক মেলানো যায় না।

১) যাত্রাপথ – আমাদের যাত্রাপথ ছিল শিয়ালদা থেকে নামখানা হয়ে লঞ্চে। প্রথমে ট্রেনে শিয়ালদা থেকে লক্ষীকান্তপুর, কাকদ্বীপ পেরিয়ে নামখানা। ওই দুটি জায়গার নাম উল্লেখ করলাম দুটি কারণে। প্রথমতঃ, শিয়ালদা থেকে সব সময় নামখানার সরাসরি ট্রেন নাও পাওয়া যেতে পারে, সেক্ষেত্রে লক্ষীকান্তপুর অবধি গিয়ে সেখান থেকে নামখানার অন্য ট্রেন ধরতে হয়। আর নামখানার আগেই পড়ে কাকদ্বীপ, সেখানে নেমেও লঞ্চে নদী পেরিয়ে কচুবেড়িয়া হয়ে গঙ্গাসাগর যাওয়া যায়। তবে সে পথে সময় আর খরচ দুইই বেশী লাগে, তাই মনে হয়, নামখানা হয়ে যাওয়াই বেশী সুবিধের। শিয়ালদা থেকে ঘন্টা তিনেকের পথ নামখানা, সেখানে স্টেশন থেকে টোটোয় মিনিট দশেকে নদীর ঘাট, তারপর লঞ্চে মুড়িগঙ্গা নদী পেরিয়ে একঘন্টা পরে ওপারে চেমাগুড়ির বেণুবন ঘাট। নদী এখানে সাগরের খুব কাছেই, তাই একদিকে যেমন তার বিশাল বিস্তৃতি, তেমনই জলে সারাক্ষণই থাকে বড় বড় ঢেউয়ের আনাগোনা । বেণুবন ঘাট থেকে আবার টোটো বা ম্যাজিক গাড়ীতে গঙ্গাসাগর – মোটামুটি এই হচ্ছে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘন্টায় গঙ্গাসাগর পৌঁছনোর ব্যবস্থা।( ছবিতে একটি ম্যাপ দিয়ে দিলাম – তাতে হয়ত বোঝার একটু সুবিধে হতে পারে ) ।

গঙ্গাসাগর যাওয়ার পথে নামখানা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম – ছবি – সুব্রত ঘোষ
নামখানা থেকে গঙ্গাসাগরের নদীপথে এই ধরণের লঞ্চ যাতায়াত করে। ছবি – সুব্রত ঘোষ

২) থাকা-খাওয়া — আগেই বলেছি, গঙ্গাসাগরে সেরকম কোন উচ্চমানের থাকার ব্যবস্থা সেভাবে নেই। সরকারী বিভিন্ন দপ্তরের কিছু আবাস আছে, আছে ইয়ুথ হোস্টেল বা পঞ্চায়েতের বাংলোও। তবে, নিয়ম কানুন পেরিয়ে সব সময় সেগুলি পাওয়া একটু মুস্কিল হতে পারে। সেক্ষেত্রে থাকার ব্যবস্থা খুঁজে নিতে হয়, কপিলমুনির আশ্রম, সীতারামদাস ওঙ্কারনাথ আশ্রম, রামকৃষ্ণ মিশন বা ভারত সেবাশ্রমে। আমরা ছিলাম ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের যাত্রী নিবাসে। প্রচুর ঘর, প্রায় দেড় হাজার মানুষের থাকার ব্যবস্থা। তবে ঘর খুবই সাধারণ, সাধারণ চৌকি পাতা, কিছু ঘরের সঙ্গে বাথরুম থাকলেও সব ঘরে তা নেই।চাদর বা মশারী ওঁরাই দিয়ে দেন। মেলার সময় ছাড়া, অন্য সময়ে গেলে মোটামুটি সহজেই ঘর পাওয়া যেতে পারে। গেটের বাইরেই কয়েকটি দোকান আছে – সেখানে সকালের জলখাবার থেকে শুরু করে দুপুরের খাবার, রাতের খাবার, মাছ, মাংস, ডিম – সবই পাওয়া যায় । এছাড়া ভারত সেবাশ্রমেও আগে থেকে তিরিশ টাকা দিয়ে কুপন করে রাখলে দুপুরে মোটামুটি ভালো খাবার পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই নিরামিষ। এ ছাড়া, এখানে থাকার আরো সুবিধে হল – ১) কপিলমুনির মন্দির আর সমুদ্রতট মোটামুটি এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যেই, ফাঁকা রাস্তায় আস্তে আস্তে হেঁটেই যাওয়া যায়। ২) গেটের সামনেই সারাক্ষণ অনেক টোটো দাঁড়িয়ে থাকে, দরকারে সেই টোটো করেই মন্দির, সমুদ্রতট, লঞ্চঘাট বা অন্যত্র যাওয়া যায় । আর ৩) ভারত সেবাশ্রমের মন্দিরটি অত্যন্ত সুন্দর, আর তেমন দর্শনীয় এঁদের সান্ধ্য আরতি। ( এঁদের মন্দিরের কথায় আসব পরবর্তী পর্বে ) ।

গঙ্গাসাগরের ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ – বাইরে থেকে। ভেতরে মূল মন্দির দেখা যাচ্ছে – ছবি – সুব্রত ঘোষ

৩) সমুদ্রতট – গঙ্গাসাগরে মূল আকর্ষণ অবশ্য দুটি – কপিলমুনির মন্দির ও সমুদ্রতট। আজ আমরা দেখে নিই সাগর, কাল দেখব কপিলমুনির মন্দির। ভারত সেবাশ্রম থেকে বেরিয়ে ডানদিকে সোজা রাস্তা ধরে গেলেই খানিক পরে আর একটি বিশাল চওড়া রাস্তা – তার ডানদিকে কপিলমুনির মন্দির আর বাঁ দিকে সোজা গেলে বঙ্গোপসাগর। এখানকার সাগর, পুরী বা দীঘার মতো একেবারেই উচ্ছল নয়, বরং খুবই শান্ত। পুরীতে দূর থেকেই সমুদ্রগর্জন শোনা যায়, এখানে সাগরের তীরে দাঁড়িয়েও প্রায় কোনো শব্দই শোনা যায় না, হাল্কা ঢেউগুলি প্রায় নিঃশব্দেই চরণ ছুঁয়ে যায়।তবে, রাতের দিকে জোয়ারে সমুদ্র এগিয়ে আসে অনেকটাই, ভোর হবার আগেই আবার তা পিছিয়ে যায়।

গঙ্গাসাগরের ফাঁকা রাস্তা। মেলার সময় এই সব রাস্তাই ভীড়ে পরিপূর্ণ হয়ে যায় – ছবি – সুব্রত ঘোষ

সকালে সমুদ্রতীরে তাই অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকে কাদা, ভিজে বালি আর মাঝে মাঝে অল্প কিছু জল। সমুদ্রের অবস্থান এখানে এমনই, যে একই সঙ্গে সকালের সূর্যোদয় আর সন্ধ্যের সূর্যাস্ত – দুইই দেখা যায় এখান থেকে। অসাধারণ সৌন্দর্যময় দুটি মুহূর্ত, যেখানে মেঘের নানা রঙের আল্পনার সঙ্গে মিশে যায় ভোরের আর দিনান্তের সমুদ্রের রঙ – আকাশ আর জল মিলে সৃষ্টি হয় কিছু অনির্বচনীয় মুহূর্তের। তবে মোহনা এখান থেকে খুব ভাল দেখা যায় না, অনেক দূরে তার আভাস মেলে। সকালে সূর্যোদয়ের পর সমুদ্রতটে আগমন ঘটে কিছু পূজারীর, তাঁদের সঙ্গে থাকে শিবলিঙ্গ, পুজোর উপকরণ – বেশ কিছু মানুষ সমুদ্রস্নান সেরে তাঁদের হাত ধরেই অর্ঘ্য নিবেদন করেন দেবাদিদেব মহাদেবের উদ্দেশ্যে, যে মহাদেব মহাস্রোতস্বিনী গঙ্গার বেগকে ধারণ করেছিলেন তাঁর জটায় । এছাড়া সাগরতটে রাখা থাকে মকরবাহিনী গঙ্গার দুটি মূর্তি, পুণ্যার্থীরা পুজা দেন সেখানেও। দেবতার উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য দেওয়ার পাশাপাশি মর্ত্যের জীবও সেবা পায় এখানে। একটু বেলা হলেই এখানকার সাগরতীর ভরে যায় প্রচুর গরু আর কুকুরে, তারা সবাই আশায় থাকে কিছু খাবারের।

নামখানা থেকে গঙ্গাসাগরের পথে বেনুবন লঞ্চ ঘাট – ছবি – সুব্রত ঘোষ

বহু মানুষ তটভূমির অস্থায়ী দোকান থেকে বিস্কুট এবং অন্যান্য খাবার কিনে খেতে দেন এই সব অবোলা প্রাণীদের, তারা ঘিরে ধরে সেই সব মানুষদের। কোন ক্ষতি করে না তারা, শুধু সামান্য কিছু খাবার চায়, আর চায় কিছু আদর ও ভালবাসা । অপেক্ষাকৃত নির্জন সেই সমুদ্রতীরে সেও এক বিচিত্র দৃশ্য, মানুষ আর অন্য প্রাণীর এক আশ্চর্য পারস্পরিক বন্ধুত্বের। সকালের সেই সমুদ্রতীরে খোঁজ চলে আরও এক প্রাণীর – বালির মধ্যে লুকিয়ে থাকা লাল কাঁকড়ার । তবে সহজে দেখা পাওয়া যায় না তাদের, শুধু চোখে পড়ে অজস্র ছোট বড় গর্তের । দিনের আলোয় সমুদ্র আর পাড়ের যে রূপ, সূর্যাস্তের পর তা বদলে যায় একবারেই । সন্ধ্যে নামলেই আসেন আর একদল পূজারী প্রদীপ নিয়ে – সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে চলে তাঁদের গঙ্গারতি, উচ্চারিত হয় শ্রী শঙ্করাচার্য রচিত গঙ্গা স্তোত্র । সন্ধ্যের অন্ধকার গাঢ় হয়, সমুদ্রতীর হয়ে ওঠে নির্জন থেকে আরও নির্জন ।

গঙ্গাসাগরের সমুদ্রতীরে সন্ধ্যা নামার পর সমবেত গঙ্গা বন্দনা – ছবি – সুব্রত ঘোষ

রাস্তার ওপরে অল্প কিছু শাঁখ ও ঝিনুকের দোকানে আলো জ্বলে ওঠে । সাগরতট থেকে সোজা রাস্তা দিয়ে দেখা যায় আলোকিত কপিলমুনির মন্দির – সেই চওড়া পরিষ্কার রাস্তা যেন মনে করিয়ে দেয় পুরীর গ্র্যান্ড রোড কে । একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে কপিলমুনির মন্দির – এই দুইই তো গঙ্গাসাগরের প্রাণ । সেই কপিলমুনির মন্দিরের কথা বলব আগামী কাল।

গঙ্গাসাগরে সমুদ্রের দিকে যাওয়ার পথে বিভিন্ন সামুদ্রিক জিনিষের স্টল ।- ছবি – সুব্রত ঘোষ

গঙ্গাসাগরের সমুদ্রতীরে প্রায় নির্জন সকাল – ছবি – সুব্রত ঘোষ

Loading...

চাক‌রির খবর

ভ্রমণ

হেঁসেল

    জানা অজানা

    সাহিত্য / কবিতা

    সম্পাদকীয়


    ফেসবুক আপডেট